কী ব্যাপার মাহি,হঠাৎ তোর মধ্যে এতো পরিবর্তন কীভাবে হলো? মাসজিদে এসে সালাত আদায় করার জন্য তোকে আমি কতো বুঝিয়েছি, কতো বুঝিয়েছি গান বাজনা, হারাম রিলেশনশিপ ত্যাগ করার জন্য। তোকে আমি এ-ও বুঝিয়েছি যে, সময় থাকতে মৃত্যু আসার আগে আগেই আল্লাহর দিকে ফিরে আয়। কিন্তু তুই বুঝলি না। তোর একটাই কথা ছিলো যে,যুবক বয়স ফূর্তির বয়স। এ বয়সে ফূর্তি করা না হলে আর কবে করা হবে, কবে নিজের জীবনকে উপভোগ করা হবে ইত্যাদি আরও কতো কথা যে তুই আমাকে শুনাতি তার কোনো ইয়ত্তা নেই। মোটকথা,তোকে বুঝিয়ে আমি কোনোভাবেই পাত্তা পেতাম না। যাইহোক, আজকে তোর মধ্যে এমন পরিবর্তন দেখে মনটাই ভরে গেলো। টুপি- পাঞ্জাবি পরিধান করাতে আজ তোকে খুব সুন্দরই লাগছে। মা শা আল্লাহ!
--মনটা ভালো না রে, সাঈদ। তুই তো শুনেছিস যে, তুই ট্রেনিংয়ে যাওয়ার দু'দিন পরই আমার চাচাতো ভাই মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছে। এখনো তার বিভৎস লাশের চেহারা আমার চোখে মুখে ভেসে বেড়াচ্ছে। তার মৃত্যুর পর কয়েক রাত নির্ঘুম কেটেছে। এখনো তার কথা মনে পড়লে নিজেকে সামলাতে পারি না।
--হ্যাঁ,তা শুনেছি। ভাইটির জন্য আমার খুব কষ্ট লেগেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমি চার সপ্তাহের ট্রেনিংয়ের জন্য শহরে থাকায় তার জানাজায়ও উপস্থিত থাকতে পারি নি। আজ সকালেই বাড়িতে ফিরেছি। আসিফের জন্য দুঃখ করিস না বন্ধু। আমাদেরকেও তো একদিন না একদিন তার মতোই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে। সেজন্যই বলি,বেলা ফুরাবার আগে আমাদের উচিত আখিরাতের পাথেয় জোগাড় করতে নিজেদের তৎপরতা নিশ্চিত করা।
--হ্যাঁ,এখন আমি সেটাই হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারছি।আসলে,আমার চাচাতো ভাইয়ের দুর্ঘটনা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। আমি ভাবতেই পারি নি,এতো সকাল তার মৃত্যু হয়ে যাবে,এতো সকাল সে আমাদেরকে ছেড়ে চলে যাবে। সে বয়সে আমার বছর পাঁচেক ছোটো। তার অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু দেখে আমার উপলব্ধি হলো আসলেই এই দুনিয়া থাকার জায়গা নয়, আসলেই মৃত্যুর কোনো সময় নাই। মৃত্যু যেমন কারো বয়সের ভার দেখে আসে না তেমনি কারো বয়সের অপ্রাপ্ততাও দেখে আসে না।
আসিফের আকস্মিক মৃত্যু আমার ধারণাটাই পাল্টে দিলো। আমার ধারণা ছিল,আমি অনেক দিন বেঁচে থাকবো, বৃদ্ধ হলে তাওবা করে ইবাদত বন্দেগীতে মনোযোগী হবো। কিন্তু না!তার আকস্মিক মৃত্যু আমার কাছে মোটাদাগে একটি প্রশ্ন রেখে গেলো যে, হে যুবক! কে তোমাকে অনেক দিন বেঁচে থাকার গ্যারান্টি দিলো? কে তোমাকে বৃদ্ধ হওয়ার নিশ্চয়তা দিলো?
তারপর এই তো গতো দুই সপ্তাহের আগের এক জুম্মায় হুজুর উনার বয়ানের এক পর্যায়ে বলছিলেন যে, আমরা যারা এখনো তাওবা করে পাপ কাজ থেকে ফিরে আসছি না কিংবা পাপকে পাপ হিসেবে নিজের কাছে উপলব্ধি হচ্ছে না বরং ক্রমেই পাপ করেই চলছি এবং মনে মনে ভেবে রেখেছি মৃত্যুর আগে আগে তাওবা করে নেবো তাদেরকে পবিত্র কোরআনের সেই আয়াতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যেখানে আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন,
আর এমন লোকদের জন্য কোনো ক্ষমা নেই, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, এমনকি যখন তাদের কারো মাথার উপর মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন বলতে থাকে,আমি এখন তওবা করছি।আর তওবা নেই তাদের জন্য, যারা কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। আমি তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক আযাবের ব্যবস্থা করে রেখেছি। [১]
বিশ্বাস কর বন্ধু সাঈদ, এই হৃদয় জাগানিয়া আয়াত শুনতে না শুনতেই ভয়ে আমার ভিতরে এক ধরণের কম্পন শুরু হয়ে গেলো। কারণ আমি তো মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম যে, বৃদ্ধ বয়সে তাওবা করে পরিপূর্ণ ইবাদত শুরু করবো। কিন্তু আমি যদি তার আগেই আমার ঐ চাচাতো ভাইয়ের মতো হঠাৎ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় মারা যাই তাহলে আমি তাওবা করার সুযোগ পাবো কোথায়?ভাবতেই আমার গাঁ শিউরে উঠলো।কারণ তুই জানোস না আমি যেসব পাপ কাজে লিপ্ত ছিলাম এগুলোর প্রতি অনুতপ্ত হয়ে তাওবা না করা অবস্থায় আমার মৃত্যু এসে হাজির হলে আমার জন্য জাহান্নাম ব্যতীত অন্য কোনো স্থান উপযুক্ত হতো না।ফলে আমি যে শয়তানের কত্তো বড়ো ধোঁকার মধ্যে ছিলাম তা তখনই উপলব্ধি হয়েছিলো।
হুজুরের ওই বয়ান শুনে আমার এই উপলব্ধি আসার পর আমি নামাজ শেষে হুজুরের সাথে দেখা করে কিছু বিষয় জানতে চেয়েছিলাম। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে,হুজুর!জীবনে অনেক পাপ কাজ করেছি।বৃদ্ধ বয়সের অপেক্ষায় তাওবাকে বিলম্ব করে চলছিলাম।কিন্তু আমার চাচাতো ভাইয়ের যুবক বয়সে হঠাৎ মৃত্যুতে আমার বৃদ্ধ হওয়ার ধারণাটাই পাল্টে দিলো। এদিকে আজকে আপনার বয়ানে তাওবা বিলম্বকারীদের প্রতি একটি কঠিন বার্তা পেলাম যা শুনে রীতিমতো আমার শরীরের লোমগুলোতে যেনো বিদ্যুৎ বয়ে গেলো। এখন আপনার কাছে আমার প্রশ্ন হচ্ছে,আমার মতো জঘন্য পাপীর তাওবা কবুল হবে তো?
তিনি আমাকে অভয় দিয়ে সুন্দর ভাষায় অত্যন্ত বিনয়ী কন্ঠে বললেন,মাহি ভাই! কেনো কবুল হবে না! আল্লাহ তো "ইন্নাহু কা'নাতাওয়া'বা অর্থাৎ তাওবা কবুলকারী। ফলে আপনার তাওবা কবুলের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। অবশ্যই কবুল হবে।আপনি নিরাশ হবেন না।আপনি আপনার গোনাহের প্রতি অনুতপ্ত হতে পেরেছেন তাতেই আল্লাহ নিশ্চয়ই অনেক খুশি হয়েছেন। আপনি আর বিলম্ব না করে আপনার সমস্ত গোনাহের জন্য আল্লাহর নিকট তাওবাতুন নাছুহা তথা খাঁটি তওবা করে ফেলুন।আপনার জন্য আশান্বিত একটি হাদীস শুনাই।
রাসূল (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া উট খুঁজে পেয়ে যতোটা খুশি হও,আল্লাহ তা'য়ালা তার বান্দার তাওবাতে এর চেয়েও বেশি খুশি হন। [২]{iiInfo}
একবার ভাবুন তো,মরুভূমির মতো অচেনা জায়গায় যেখানে আপনার উটই একমাত্র অবলম্বন সেখানে যদি আপনি আপনার উট হারিয়ে ফেলেন এবং এক পর্যায়ে হঠাৎ সেটি ফিরে পান তবে আপনার কেমন অনুভূতি হবে? আপনি কি সেই অনুভূতির কথা ভাবতে পারেন?
এছাড়া,পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'য়ালা তার বান্দাকে বুকভরা আশা দেখিয়ে বলেছেন, “বলো- হে আমার বান্দারা,যারা নিজেদের উপর যুলুম বা অবিচার করেছো তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করেন।তিনি ক্ষমাশীল,পরম দয়ালু।” [৩]
দেখুন মাহি ভাই,দুনিয়ার কারো সাথে কোনো অন্যায় করে তার কাছে মাফ চাইলে সে হয়তো আপনাকে বুকে জড়িয়ে তার ভালোবাসা প্রকাশ করবে না।কিন্তু আল্লাহর কোনো বান্দা তার অবাধ্যতা থেকে ফিরে এসে তাওবা করলে এবং নিজের ঈমান-আমলকে পরিশুদ্ধ করে নিলে তার জন্য তার রবের পক্ষ থেকে বিশাল একটি সুখবর রয়েছে।জানেন সে সুখবর কী?সে পরম সুখবর হচ্ছে,তাওবাকারীর প্রতি তাদের রব ভালোবাসা প্রকাশ করে বলেছেন,I love you.[৪]
সুবহান'আল্লাহ! এবার আপনিই বলুন,তাওবাকারীর প্রতি আল্লাহর এতো ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও কি তাওবা কবুলের ব্যাপারে আমাদের কারো মধ্যে কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে? নিশ্চয়ই না।সমস্যা হচ্ছে আমরা হতভাগারা নফসের ধোঁকায় পড়ে সময় থাকতে বুঝতে পারি না।কেবল গোনাহ করতেই থাকি। যখন বুঝি তখন আপসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
অপরদিকে,আল্লাহ তা'য়ালা আরও বলেছেন, “যারা তাওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নেক কাজ করে,আল্লাহ তাদের গুনাহকে পুন্য দ্বারা পরিবর্তীত করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল,পরম দয়ালু।” [৫]
এখানে খুবই লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে,তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে এসে নেক আমল করলে শুধু আপনার গোনাহই মাফ হচ্ছে না,আল্লাহ তা'য়ালা বরং আপনার গোনাহগুলোকে নেকী দ্বারা পরিবর্তীত করে দিচ্ছেন।সুবহান'আল্লাহ!একজন বান্দার জন্য তার রবের দিকে প্রত্যাবর্তন করার জন্য এর চেয়ে বড়ো অনুপ্রেরণা কিংবা বড়ো পুরষ্কার আর কী হতে পারে!আসলে,আল্লাহ যে কতো মহান,কতো দয়ালু তা আমরা চিন্তাই করতে পারবো না।দুঃখের বিষয় হচ্ছে,আমরা আল্লাহর দয়াকে উপলব্ধি করতে পারি না। আল্লাহর দয়া,রহমত উপলব্ধি করতে পারা কোনো মানুষই নিরাশ হয়ে থাকতে পারে না,আল্লাহ বিমুখ হয়ে থাকতে পারে না
এভাবেই হুজুর আমাকে কোরআন হাদীসের আলোকে তাওবার তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বুঝিয়েছিলেন এবং আল্লাহর অনুগত বান্দা হয়ে চলার জন্য আরো বেশ কিছু পরামর্শও দিয়েছিলেন।তারপর থেকে নিজেকে বদলানোর চেষ্টায় আছি।জানি না আল্লাহর দিকে কতোটুকু প্রত্যাবর্তন করতে পেরেছি তবে চেষ্টা করে চলছি। আমার জন্য দোয়া রাখিস বন্ধু যেনো আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর আমৃত্যু চলতে পারি।
--অবশ্যই বন্ধু। আসলে,তোর প্রত্যাবর্তনের গল্প শুনে খুব ভালো লাগলো।আলহামদুলিল্লাহ!বিশেষ করে হুজুর যেভাবে তোকে বুঝিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়।তিনি এমনভাবে বুঝিয়েছেন যাতে তোর আত্ন-উপলব্ধি হয়।আর আত্ন উপলব্ধিই মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। যাইহোক,তোর মতো এভাবে সবাই যদি দুনিয়ার অস্থায়ীত্ব উপলব্ধি করতে পারতো,মৃত্যুর অবস্থান যে কতো নিকটে তা যদি সবাই অনুধাবন করতে পারতো তবে তারাও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন না করে পারতো না,পারতো না তাওবা কে ঝুলিয়ে রেখে অগোছালো জীবনযাপন করে যেতে।
--হ্যাঁ,আমি দোয়া করি আল্লাহ যেনো আমাদের সকল ভাই বোনকে হেদায়েত নসিব করেন এবং মৃত্যু অবধি হেদায়েতের ওপর অটল থাকার তাওফিক দান করেন।আমিন!
--সুম্মা আমিন!
রেফারেন্সঃ
[১] সূরা আন নিসা,আয়াত নং : ১৮
[২] সহীহ বুখারী,হাদীস নং : ৬৭০৯
[৩] সূরা আঝ ঝুমার,আয়াত নং : ৫৩
[৪] সূরা আল বাকারা,আয়াত নং : ২২২
[৫] সূরা আল ফুরকান,আয়াত নং : ৭০
কিছু কথাঃ
গল্পের মাহি,যে কিনা চলার পথে বেপরোয়া ছিলো, হারাম ছিলো যার নিত্যদিনের সঙ্গী, যার অন্তরে ছিলো না মৃত্যুর কোনো ভয় তার মতো পথ হারা ব্যক্তি যদি পথের সন্ধান পেয়ে দুনিয়ার অস্থায়ীত্ব উপলব্ধি করে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে পারে তবে আমরা কেনো পারবো না। সে যদি হুজুরের বয়ান শুনে তাওবার গুরুত্ব বুঝতে পারে তবে আমরা কেনো বুঝতে পারবো না। আমাদের কেবল জাগরণের প্রয়োজন, যে জাগরণ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে চিরস্থায়ী সুখময় স্থান জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছে দিবে।
রাকিব আলী
সর্বশেষ সংস্করনঃ 2022-02-04T14:11:07+06:00