(১) সায়েমের বয়স এখন পঁচিশ। যৌবনের তাজা সময়। টগবগে রক্ত আর উচ্ছ্বসিত আবেগ ভরা যৌবন। এই সময়ের ব্যাচেলর ছেলেদের সবচেয়ে কষ্টের বিষয় একাকীত্ব। টগবগে তাগড়া জোয়ানিতে একা একা থাকা ভীষণ কষ্টকর। এই বয়সের ছেলেদের অভিব্যক্তি কেমন হয়? মনে হয় এমন- "মন চায়, কারো সাথে মন খুলে কথা বলি। কারো হাত ধরে হেঁটে চলি শিশিরাবৃত সবুজ ঘাসে। কষ্টে যখন বুকটা অশান্ত হয়ে যায়, তখন কারো কোলে মাথা রেখে একরাশ শান্তি খুঁজি।"
কিন্তু একজন মুসলিম যুবক নিজের বৈধ স্ত্রী ছাড়া এসব আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করার সুযোগ পায় না। কোন পরনারীর সাথে সম্পর্ক রাখা ইসলামে নিষিদ্ধ। সায়েমের এটা ভালো করেই জানা আছে। যার জন্য সে সব সময় নিচের দিকে তাকিয়ে পথ চলে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কোন পরনারীর সাথে কথা বলেনা। নিজেকে সব অশ্লীলতা থেকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু প্রবৃত্তি ওকে বারবার উস্কানি দিচ্ছে। অবৈধ সম্পর্কের পথে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সেজন্য ও ভীষণ চিন্তায় আছে। কিভাবে কি করবে বুঝতে পারছিল না।
(২) বাড়িতে বাবা-মার কাছে বিয়ের কথা বলেছে সায়েম। বাবা কিছুটা আপত্তি করলেও শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে যান। তার বাবা বলেছিলেন, "তোমার বাবা আটাশ বছরে বিয়ে করেছে। তুমিও আটাশে বিয়ে করবে। তাছাড়া বিয়ে করতে হলে তো খরচ লাগবে। তোমার বাবার পক্ষে আপাতত বিয়ের খরচ দেওয়া মুশকিল।" সায়েম জবাবে বলেছিলো, বাবা! তোমাদের যুগ আর আমাদের যুগ সমান না। তোমাদের যুগে পরিবেশ ভালো ছিলো। তখনকার অধিকাংশ নারীরা শালীন ছিলো। তারা পর্দা পুশিদা করতো। আর আমাদের যুগ খুব খারাপ। এখনকার অধিকাংশ নারীরা খুব উচ্ছৃঙ্খল ভাবে চলাফেরা করে। এজন্য যুবকদের রাস্তাঘাটে চলতে খুব কষ্ট হয়। নিজের ঈমানকে হেফাজত করা এই সময়ে অনেক বড় পরীক্ষা। তাই নিজের ঈমান আমল রক্ষার্থে আমার বিয়ে করা প্রয়োজন। আর বিয়ের খরচ নিয়ে আমি চিন্তা ভাবনা করবো। আপনি শুধু বিয়ের পক্ষে মতামত দিলেই হবে। ছেলের কথাবার্তা আর আবেগ দেখে বাবা আর না করতে পারেননি। রাজি হয়ে যান।
সায়েমের বাবা-মা তাকে বিয়ে দিতে রাজি হয়েছেন। এজন্য সায়েম তার বাবা-মার প্রতি কৃতজ্ঞ। এবার তাকে বিয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্রী নির্বাচন করতে হবে। প্র্যাক্টিসিং মুসলিম ছেলেদের কাছে একজন প্র্যাক্টিসিং মুসলিমাহ জীবনসঙ্গিনী পরম আরাধ্য। একজন মুসলিমের কাছে বিয়ে শুধু ফ্যান্টাসির নাম না। বরং আল্লাহ তাআলার পথে চলার জন্য একজন উপযুক্ত সহযোগী নির্বাচনের অন্যতম মাধ্যম বিয়ে। একে অপরের পরিপূরক হবে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দেবে, প্রতিটি মুমিন-মুমিনা এমন জীবনসঙ্গী-ই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। কিন্তু বর্তমান যুগে একজন ভালো মেয়ে/ছেলে খুঁজে পাওয়া বিশাল কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সবদিকে খারাপের ছড়াছড়ি। অশ্লীলতায় গা ভাসিয়ে দেওয়া তরুণ-তরুণীদের সংখ্যা বেশুমার। এই নষ্ট সমাজের ভেতর থেকে একজন পুণ্যবতী খুঁজে বের করা বড়ই জটিল।
(৩) একজন পুণ্যবতী মেয়েকে নিজের জীবনসঙ্গিনী হিসেবে নির্বাচন করা সায়েমের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। এজন্য সে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ খবর নিচ্ছে। পরিচিত জনদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলেছে। কিন্তু সামষ্টিক বিবেচনায় একজন ভালো মেয়ে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিন মাস চলে গেছে মেয়ে খুঁজতে খুঁজতে। সায়েম ক্লান্ত হয়ে গেছে। কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না।
অবশেষে ক্লাসমেটদের সাথে বিষয়টি শেয়ার করলো। ওরা তাকে জিজ্ঞেস করলো, কোন ক্যাটাগরির মেয়ে তোর পছন্দ? তোর কল্পনায় আঁকা তোর জীবনসঙ্গিনী কেমন, সেটা আমাদের খুলে বল। সায়েম ওদের দুষ্টুমিপূর্ণ কথা শোনে মুচকি হাসলো। বললো, তোরা আসলে যথেষ্ট বুদ্ধিমান। আচ্ছা, যা হোক, আমি তোদেরকে বলি কোন কোন বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় রেখে আমি মেয়ে খুঁজছি-
১. মাহরাম-গায়রে মাহরাম পরিপূর্ণ ভাবে মেনে চলে। পর্দার ব্যাপারে কোন ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নেই। যে হবে নিজের আত্মমর্যাদার ব্যাপারে চূড়ান্ত সতর্ক।
২. বাকসংযমী হতে হবে। কারণ চিন্তা ভাবনা করে যার কথা বলার অভ্যেস আছে, সে খুব কম বিপদে পড়ে। আর মেয়েদের জবান খুব রিস্কি। পরিবারে সাধারণত ঝগড়া বাধে মেয়েদের কারণে। সে জন্য কথাবার্তার ব্যাপারে যে মেয়ে আত্মসংযমী হবে, তাকে নিয়ে জীবন কাটানো অনেক স্বস্তির, শান্তিময়।
৩. স্বামীঅন্তপ্রাণা হতে হবে। এর জন্য সবচেয়ে বড় প্রমাণ তার মায়ের চরিত্র। বাবার সাথে মায়ের ব্যবহার যদি ভাল হয়, তার মা যদি তার বাবার সাথে সম্মানজনক আচরণ করে, তাহলে আশা করা যায় ইনশাআল্লাহ মেয়েও সেরকম হবে। কারণ মেয়েরা সাধারণত মায়ের চরিত্র পায়।
৪. সব ক্ষেত্রে শরীয়াকে ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। শরীয়ার প্রতিটি নির্দেশনার প্রতি ভালোবাসা আর সম্মান থাকতে হবে। দ্বীনের বুঝ থাকতে হবে।
মোটকথা, একজন পুণ্যবতী খুঁজছি। পুণ্যবতী বলতে আল্লাহ তাআলার বেঁধে দেওয়া বিধান মোতাবেক নিজেকে যে পরিচালিত করে এমন মেয়ে।
আর তার সৌন্দর্য নিয়ে এত বেশি মাথা ঘামাচ্ছি না। যতটুকু সৌন্দর্যে চোখের শীতলতা আসে, ততটুকু হলেই হবে। অতি সুন্দরী প্রয়োজন নেই।
(৪) সায়েমের বন্ধুরা ওর কথা শুনে হাসতে হাসতে শেষ। তবে তারা সায়েমের প্রশংসা করছে। তারা বললো, আসলে তোর চিন্তাভাবনা অনেক উন্নত। আল্লাহ তাআলা তোকে একজন পুণ্যবতী জীবনসঙ্গিনী দান করুন।
সায়েমের বন্ধুদের মাঝে মাহমুদ তুলনামূলক জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান। সেজন্য সায়েম মাহমুদকে লক্ষ্য করে বললো, মাহমুদ, তুই কিছু বল না ভাই। কিভাবে কি করা যায় একটু পরামর্শ দে। মাহমুদ হেসে বললো, আমি আর কি বলবো। বেশি করে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া কর। আল্লাহ তাআলা ইনশাআল্লাহ সবকিছু সহজ করে দেবেন। আর আমার মনে হয়, তোর যদি কোন মেয়েকে আগে থেকে পছন্দ থাকে, তাহলে ওই পরিবারে প্রস্তাব দিয়ে দেখতে পারিস। 'পছন্দ থাকে' বলতে আমি এটা বোঝাচ্ছি না যে, তার সাথে আগে থেকে তোর কোনো রিলেশন আছে। আমি বুঝাচ্ছি, যে মেয়েকে জীবন-সঙ্গিনী হিসেবে তুই পেতে চাস, তার মাঝে এই গুণগুলো আছে। তার পরিবারের কারো সাথে হয়তো বা তোর সম্পর্কও আছে। দেখ, এমন হলে ভালো হয়। আর না হয় কে কোন জায়গা থেকে কোন মেয়ে এনে দেবে, তার সাথে তোর বোঝাপড়া ভালো হবে কিনা, এটা নিয়ে পরবর্তীতে পেরেশানিতে পড়তে হতে পারে। তাই নিজের চেনাজানা ভালো মেয়ের পরিবারে প্রস্তাব দেওয়া উত্তম হবে বলে মনে করি।
মাহমুদের কথা সায়েমের ভালো লাগলো। সায়েম মাহমুদকে বললো, জাযাকাল্লাহু খাইরান দোস্ত। অনেক সুন্দর পরামর্শ দিয়েছিস। আমি তোর কথা মতো আমল করার চেষ্টা করবো ইনশা আল্লাহ।
(৫) ফারহান সায়েমের বন্ধু। সিলেটে দুজন একসাথে পড়াশোনা করেছে। ফারহানের পরিবার দ্বীনদার। পরিবারের সবাই ইসলামকে ভালো করে ফলো করে। পরিবারের নারীরা পর্দা পুশিদা মেনে চলে। পারিবারিক ভাবে তারা আলেমদের সম্মান করে। সায়েমের আগে থেকে চিন্তা ছিলো ফারহানের ছোট বোনকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে। কিন্তু সাহস করতে পারছিল না। মাহমুদের কথায় সাহস পেয়ে ফারহানের চাচা সাদমানের সাথে এ ব্যাপারে কথা বললো। সাদমানও সায়েমের বন্ধু। বয়সে কাছাকাছি। অবশ্য ফারহানের সাথে বন্ধুত্ব থাকার সুবাদে সাদমান সায়েমকে মজা করে ভাতিজা বলে ডাকে। সায়েমের কথা শুনে সাদমান বললো, ভাতিজা সায়েম! তোমার সাথে আমার ভাতিজিকে খুব মানাবে। তুমি ফারহানের চাচাতো ভাই হাম্মাদের সাথে কথা বলো। ইনশাআল্লাহ আমার বিশ্বাস, তারা তোমার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেবেন না। সাদমানের কথায় ভরসা পেয়ে হাম্মাদের সাথে কথা বললো সায়েম। হাম্মাদ তাকে আশ্বাস দিলো, এ ব্যাপারে সে ফারহানের পরিবারের সাথে কথা বলবে। হাম্মাদের আশ্বাসবাণী শুনে সায়েম হাম্মাদকে কৃতজ্ঞতা জানালো।
হাম্মাদ ফারহানের পরিবারের সাথে সায়েমের প্রস্তাবের ব্যাপারে কথা বললো। ফারহান যেহেতু সায়েমের বন্ধু, সে জন্য পরিবারের লোকেরা ফারহানের মতামত জানতে চাইলো। ফারহান সায়েমকে ভালো করেই চেনে। সেজন্য আর না করলো না। ফারহান বললো, আমার বোন আর তোমরা রাজি থাকলে সায়েমের প্রস্তাব গ্রহণের ব্যাপারে আমার কোনো আপত্তি নেই। হাম্মাদ তাদের সম্মতি পেয়ে সায়েমকে সব খুলে বললো। সায়েম এই সংবাদ শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলো। নিজের অজান্তেই তার চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু ঝরতে লাগলো।
সায়েম তার বাড়িতে এই কাহিনী জানালো । বাবা-মা এই সংবাদ শুনে আল্লাহর শুকর আদায় করলেন। ছেলের সুখে মা-বাবার সুখ। বাবা-মার কথা হলো, ভালো মেয়ে হলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। সায়েম জানালো, ওদের পরিবার দ্বীনদার। ইনশাআল্লাহ মেয়ে ভালো হবে। সায়েমের এবার বিয়ের খরচ যোগাতে হবে। এজন্য তার পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের কাছে করজে হাসানা চাইলো। বাড়িতে থাকার মতো একটা পার্সোনাল রুম আর বিয়ের সামান্য খরচ। টাকার ব্যবস্থা করতে সায়েমের অবশ্য অনেক কষ্ট হয়েছিল। এজন্য বিয়েটা তাড়াতাড়ি হওয়ার বদলে মাস চারেক পিছিয়ে যায়। অবশেষে আল্লাহ তাআ'লা সব ব্যবস্থা করে দিলেন৷ যত প্রবলেম ছিল, সব দূর করে দিলেন। টাকা পয়সা ব্যবস্থা করে রুমের কাজ কমপ্লিট হলো। তারপর সায়েমের মা-বোন মিলে ফারহানের বোনকে দেখতে যান। মেয়ে তাদের পছন্দ হলো। মা আর বোনের পছন্দ হওয়ায় সায়েমের আত্মবিশ্বাস আরো পোক্ত হলো। কুরবানির ঈদের পরে সায়েম গিয়ে দেখে আসে ফারহানের বোনকে। পবিত্র ঘরের পবিত্র মেয়ে, এমন মেয়ে কী পছন্দ না হওয়ার কথা?! মেয়ে পছন্দ হওয়ায় সায়েম সবার সামনে উচ্চস্বরে আলহামদুলিল্লাহ বলে দেয়। আবেগে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি।
এবার বিয়ের দিন নির্ধারণের পালা। দুই পরিবারের পরামর্শে বিয়ের তারিখ ৫ই আগস্ট নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত দিনে ফারহানের বোনের সাথে সায়েমের বিয়ে হয়ে যায়। সায়েমের একাকী জীবনের সমাপ্তি টেনে যুগল জীবনের সূচনা হয়।
সায়েমের ঘরে আর একাকিত্বের আঁধার নেই। তার ঘরে এখন পূর্ণিমার ঝলকানি। ফরিদা, মানে অনন্যা। সায়েমের জীবনসঙ্গিনী। তার পরম আরাধ্য পুণ্যবতী। জান্নাতে যাওয়ার পথে তার অন্যতম সহযোগী। এবার শুরু হলো জীবনের প্রত্যাশিত যাত্রা। একজন আরেকজনের হাত ধরে এগিয়ে চলা রবের সন্তুষ্টি পানে।
আর্টিকেলটি লিখেছেনঃ মাওলানা ইমরান হোসাইন
সর্বশেষ সংস্করনঃ 2022-01-27T00:25:33+06:00
আলহামদুলিল্লাহ, খুব সুন্দর গল্প ছিলো।
ReplyDeleteA good story.
ReplyDelete