![]() |
| Photo: Collected (Unsplash) |
রাতে দেরি করে ঘুমানো বিগত কয়েকবছর ধরে আমার এক চিরাচরিত অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রতিদিনই ফজরের নামাজে উঠতে একটু সমস্যা হয়। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। আমি গভীর ঘুমে আছন্ন। তার মধ্যে শুনতে ফেলাম কেউ আমাকে ডাকছে"ওঠো,নামাজের সময় হয়ে গিয়েছে"। এই ডাকটা স্বপ্নের মধ্যে শুনতে পাচ্ছি নাকি বাস্তবে তা ঠিক বুঝতে পারলাম না। মুখের মধ্যে কেউ পানি ছিটা দিলো। এবার আর ঘুমিয়ে থাকতে পারলাম না। ঝাপসা ঝাপসা চোখে দেখলাম মাইসা একটা গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। আমি বুঝলাম পানির ছিটা স্বপ্নে নয়। সত্যি সত্যি কেউ মেরেছে। ঘড়ির দিকে ঈশারা করে মাইশা বল্লো "পাচঁ দশ বাজে। জামাত শুরু হওয়ার আর বিশ মিনিট বাকি আছে"।
ওয়াশরুম থেকে ওযু করে এসে শরীরের পানি মুছতে মুছতে মাইসাকে জিজ্ঞেস করলাম" ডাকলেইত পারতে, পানি মারার কি দরকার ছিলো?। স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে মাইশা বল্লো দাঁড়াও দেখাচ্ছি। এই বলে মোবাইলের আল হাদিস অ্যাপটি বের করে নিচের হাদিস টা দেখালো,,
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে অনুগ্রহ ধন্য করুন, যে রাতে উঠে সালাত পড়ে এবং তার স্ত্রীকেও জাগায়, তারপর সেও সালাত পড়ে। আর যদি সে (স্ত্রী) জাগতে অস্বীকার করে, তাহলে স্বামী তার মুখমণ্ডলে পানি ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহ সেই মহিলাকে অনুগ্রহ ধন্য করুন, যে রাতে উঠে সালাত পড়ে এবং তার স্বামীকেও জাগায়, আর সেও সালাত পড়ে। স্বামী জাগতে অস্বীকার করলে, সে তার মুখমণ্ডলে পানি ছিটিয়ে দেয়। [ইবনে মাজাহ-১৩৩৬] {iiSuccess}
হাদিসটতে যেহুতু স্ত্রীকে ও পানির ঝাপটা মারার কথা বলা আছে,তাই আমি ঠিক করলাম আমিও একদিন তাকে পানির ঝাপটা মেরে আজকে আমাকে মারার প্রতিশোধ নিবো। ,,,যাই হোক আমি মসজিদের দিকে রওনা হলাম।
নামায পড়ে বাসায় ফিরলাম। ফিরে দেখি মাইসা না ঘুমিয়ে কি জানি শেলাই মেশিনে শেলাই করছে। অনেকদিন যাবৎ লক্ষ্য করছি, মাইসা ফজরের পর না ঘুমিয়ে শেলাই মেশিন নিয়ে বসে পড়ে। এর কারন জিজ্ঞেস করবো করবো বলে আর করা হলো না। তাই চিন্তা করলাম আজ জিজ্ঞেস করেই ছাড়বো। যেই বলা সেই কাজ। মাইসা??মাইসা জবাব দিলো,, জ্বি। আচ্ছা তুমি ফজরের নামাজের পর না ঘুমিয়ে শেলাই করো কেনো?তখন সে আমাকে নিম্নোক্ত হাদিস টা শুনালেন,,
সাখর আল-গামিদী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মাতকে ভোরের বরকত দান করুন”। তিনি কোন ক্ষুদ্র বা বিশাল বাহিনীকে কোথাও প্রেরণ করলে দিনের প্রথমভাগেই পাঠাতেন। বর্ণনাকারী সাখর (রাঃ) একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি তার পণ্যদ্রব্য দিনের প্রথমভাগে (ভোরে) পাঠাতেন, ফলে তিনি সম্পদশালী হয়েছিলেন এবং এভাবে তিনি অনেক সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন। (আবু দাউদ -২৬০৬)। {iiSuccess}
হাদিস টা শুনার পর আমার আর কিছু বলার জো থাকলো না। তার প্রতি ভালোবাসা যেন দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। আমি রুমে বসে বসে ল্যাপটপে কাজ করতেছি। হঠাৎ করে লক্ষ্য করলাম আমার মাথায় কে যেন তেল মেখে দিচ্ছে। মাথা ঘুরিয়ে দেখি, মাইসা তেল আর চিড়ুনি নিয়ে দাড়িয়ে আছে। "এই যে মশাই চুলে শেষ কবে তেল দিয়েছেন,, শুনি?আমি মনে মনে বললাম,সত্যিই তো চুলে যে কবে তেল দিয়েছি,তা আমি ভুলেই গিয়েছি। আমি উত্তর দিলাম"এই মাস দুয়েক আগে"। কিন্তু তা আজ হঠাৎ মহারানীর আমার মাথায় তেল আর চুল আচড়ে দেওয়ার ইচ্ছা জাগলো কেনে?মাইসা বললো,কালকে রাতে একটা হাদিস পড়ে ছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম কি হাদিস। ও বললো,,,
নবী সহধর্মিণী ‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, মসজিদে ই‘তিকাফরত অবস্থায় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার দিকে তাঁর মাথা ঝুঁকিয়ে দিতেন আর আমি ঋতুবতী অবস্থায় তাঁর চুল আঁচড়িয়ে দিতাম। (বুখারি-২০২৮)। তাছাড়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুলে তেল দেওয়া আর চুল আচঁড়ানো বেশ পছন্দ করতেন। (বুখারি-১৫৩৮,১৬৭)। {iiSuccess}
আমি মাইসাকে জিজ্ঞেস করলাম "সুন্নাতের উপর করছো,, তাই না?ও মুচকি হাসি দিয়ে বল্লো " জ্বি,জাহাপনা"।
ব্যাক্তিগত কাজে একটু বাহিরে যেতে হবে। দেরি হবে বিদায় নামায পড়ার প্রস্তুতি হিশেবে গোসল করে বের হলাম। কাজ করে ফিরতে ফিরতে যোহরের আযান দিয়ে দিল। তাই আর দেরি না করে মসজিদে ডুকে পড়লাম। তাহিয়্যাতুল মসজিদ আর সুন্নাত আদায় করে পিছে তাকাতে দেখি প্রবীণ একজন ব্যক্তি নামাজ আদায় করছেন। কিচ্ছুক্ষণ উনার দিকে তাকিয়ে থাকার পর চিন্তে পারলাম উনি আমার পূর্বপরিচিত আবুল মিয়া। আজ থেকে ১০-১২ বছর আগে উনি আমাদের বাড়িতে গবাদিপশু দেখাশুনা করতেন। নামায শেষ করে বাহিরে গিয়ে উনার জন্য অপেক্ষা করলাম। উনি বের হলে উনাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,"চাচা আমাকে চিনতে পেরেছেন"। উনি বললেন " বাবা,ঠিক তো মনে পড়ছে না। তারপর আমি বাবার পরিচয় দিই। তখন তিনি আমাকে চিনতে পারেন। তারপর আমি উনাকে জিজ্ঞেস করলাম"চাচা,কেমন আছেন?ঢাকায় হঠাৎ কি কারনে?উনার উত্তর শুনে বুঝতে পারলাম উনি জীবিকার তাগিদে এখানে এসেছে,কিন্তু এখনো কোনো কাজ পাই নি। চাচা দেখে অনেক ক্ষুদার্ত মনে হচ্ছে তাই অনেক জোরাজুরি করে বাসায় নিয়ে এলাম। তারপর রিক্সায় উঠে দুইজন গল্প করতে করতে বাসায় চলে এলাম। বাসাত এসে কলিং বেল বাজালাম। মাইসা ডোর লেন্স দিয়ে তাকিয়ে দেখে আমার সাথে অচেনা এক বয়স্ক লোক। আমি বাহির থেকে বল্লাম "মাইসা আজ সাথে মেহমান আছে"।
মাইসা দরজা খুলে ভিতরে চলে গেল। আমি আবুল মিয়াকে রুমে বসালাম। আমি ভিতরে গেলাম। মাইসা জিজ্ঞেস করলো" উনি কি খাবেন?আমি বল্লাম হ্যাঁ। রান্না করেছো না?মাইসা বল্লো "শুনো, তুমিতো আমাকে জানাও নি মেহমান নিয়ে আসবে। আমিত মাত্র দুইজনের খাবার রান্না করছি"। আমি বল্লাম আচ্ছা এখন চাউল বসায় দাও চুলায়। মাইসা বল্লো, " চাউল নাই বাসায়,নিয়ে আসো তাড়াতাড়ি"।
আমি একটু চিন্তা করলাম। তারপর বললাম"আচ্ছা কিনতে হবে না। আমার একটা হাদিস মনে পড়েছে। আমি তখন নিচের হাদিসটি শুনালাম,,,
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ দু’জনের খাদ্য তিনজনের জন্য যথেষ্ট এবং তিনজনের খাদ্য চারজনের জন্য যথেষ্ট। [বুখারি-৫৩৯২]।{iiSuccess}
আজ বরং এই হাদিসের উপর আমল করি। "ঠিক আছে"-হাসিমুখে মাইসা বল্লো। সত্যিই,দ্বীনদার স্ত্রী হলে কত সুবিধা। অন্যকেউ হলে গজগজ করত। তারপর খাওয়া দেওয়া শেষে দেখলাম আরও খাবার উদ্ধৃত আছে। তা থেকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে কুল পাচ্ছি না। বিকেলে আবুল চাচা তার গন্তব্যে রওয়ানা হলো।
আমিও আবুল চাচকে এগিয়ে দিয়ে আসরেরে নামাজ পড়ে বাসায় ফিরলাম। ফিরে এসে দেখি টেবিলের উপর একটা কফি ভর্তি কাপের নিচে এক টুকরো চিরকুট। চিরকুট খুলে দেখি ওখানে লিখা আছে"কেউ চাইলে কফি নিয়ে ছাদে আসতে পারে"। আমি বুঝতে পারলাম উনি ছাদে বসে আকাশ দেখছে। আমি ছাদে গেলাম কিন্তু আমার কফির কাপ নিয়ে গেলাম না। কারন আমি জানতাম উনিও কফি খাচ্ছেন।
ছাদে গিয়ে দেখি উনি বসে বসে কফি খাচ্ছেন আর আকাশ দেখছেন। "তো মহারানী একা একা বসে আকাশ দেখা হচ্ছে বুঝি"?। মাইসা বল্লো "না,মহারাজার জন্য অপেক্ষা করছি" তারপর ও আমাকে জিজ্ঞেস করলো"তুমি কফি আনোনি কেন?কথাটা শুনার পর আমি তার হাতে থাকা কাপটি নিয়ে ও যেখানে মুখ লাগিয়ে কফি খেয়েছে সেই জায়গায় মুখ লাগিয়ে এক চুমুক কফি খেলাম। তারপর ও আমকে জিজ্ঞেস করলো। এটা কোথায় পেয়েছে? তখন আমি তাকে হাদিসটা শুনালাম,,,
আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি ঋতুবতী অবস্থায় হাড় চুষতাম, অতঃপর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেটি নিয়ে আমার মুখ লাগানো স্থানে তাঁর মুখ রেখে তা চুষতেন। আবার আমি ঋতুবতী থাকাকালে যে পাত্রে পানি পান করতাম, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেটি নিয়ে আমার মুখ লাগানো স্থানে তাঁর মুখ লাগিয়ে পান করতেন। [ ইবনে মাজাহ-৬৪০] {iiSuccess}
এই হাদিস টা শুনার মাইসা একদম লজ্জায় কুটিকিটি হয়ে যাচ্ছে। আর তখন তাকে আরও অনেক সুন্দর লাগছে। তার এই এই লজ্জা আমি বল্লাম "You have witchcraft in your lips"। আমার এই কথাশুনে মাইসা হেসে আমার বুকে আলতো করে একটা ঘুষি মারলো।
এই পড়ন্ত বিকালে সত্যিই সময় গুলা ধারুন লাগছে। তার সাথে আমাদের মিষ্টি-দুষ্টু খুঁনসুটি গুলো ভালালাগা আরও বাড়িয়ে দিল,,,এ যেন সোনায় সোহাগা। সুখে থাকার জন্য অনেক সময় একজন দ্বীনদার স্ত্রী ই যথেষ্ট। আল্লাহর কাছে লাখোকোটি শুকরিয়া আমাকে এমন একটা দ্বীনদার স্ত্রী দেওয়ার জন্য। সত্যি তুমি,"সাধারন চিত্ত্বে অসাধারণ ".।
মুহাম্মদ মারুফ উদ্দিন। {iiWriter}
সহায়তা - প্রদীপ্ত কুটির।
সর্বশেষ সংস্করনঃ 2022-09-19T21:29:02+06:00
