![]() |
| Photo: Collected - HDQWALLS |
কিশোরী থাকতে আব্বু-আম্মুর হাত ধরে পাড়ি জমালাম ভিনদেশে। তখন আমার টিনেজ মনের হরেক রকম রং এর ভিড়ে আল্লাহ আমার জন্যে পছন্দ করলেন আল্লাহর দ্বীনের রং! তখন থেকেই ধীরে ধীরে দ্বীনের গুরুত্ব বুঝতে শুরু করলাম। আমার সদ্য প্রত্যাবর্তিত যুবতী মনটা হঠাৎ ভিনদেশের অপরিচিত এক পরিবেশে এসে প্রচন্ড একটা "কালচার-শক" খেলো।
আমরা যে ছোট শহরটাতে ছিলাম, সেখানে মুসলিমরা সংখ্যায় অনেক কম! দেখা যেত আমার ইউনিভার্সিটিতে ২০০ স্টুডেন্ট এর ক্লাসে আমিই একমাত্র মুসলিমাহ জড়সড় হয়ে বসে আছি! আমার বাহ্যিক বেশ-ভূষা থেকে শুরু করে চিন্তা-চেতনা—সবকিছুতেই সবার সাথে আকাশ-পাতাল তফাৎ। অনেকেই আমার দিকে কীভাবে যেন তাকাতো! আমার অস্বস্তি লাগতো! তবে, অনেকের সাথে এই নিয়ে পজিটিভ ইন্টারেকশানও বেশ হত! কেউ আমাকে আমার ধর্ম, আদর্শ এবং এরূপ পোশাক পরিধানের কারণ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেই খুশিমনে তাকে ইসলামের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতাম। তারা অনেকেই অবাক হয়ে বলতো, "মুসলিম" আর "ইসলামের" নাম নাকি তারা জীবনে কোনদিন শুনে নাই! "ইসলাম" নামের যে একটি ধর্ম আছে, সেটাই নাকি তারা জানে না! "গুরাবাহ" বা "আগন্তুক" হওয়া কি জিনিস সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম!
একদিন ক্যাম্পাসে এমন এক ঘটনা ঘটলো যা আমাকে সারাজীবনের জন্যে নাড়িয়ে দিয়ে গেল! আমার ব্যাক-টু-ব্যাক ব্যস্ত ক্লাস-রুটিন থাকায় এক ক্লাস থেকে আরেক ক্লাসে ঢুকতে ঢুকতেই নামাজের ওয়াক্ত পাড় হয়ে যেত। হাতে সময় কম থাকায় আমি যেখানেই একটু নীরব জায়গা পেতাম, পেপার জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজটা পড়ে নিতাম। এরকম একদিন হন্তদন্ত হয়ে ক্লাসে ঢোকার আগে নামাজে দাঁড়িয়েছি লাইব্রেরির এক কোণায়। হঠাৎ এক ভিনদেশী মেয়ে আমাকে ঐ অবস্থায় দেখে চিৎকার করে উঠলো! লাইব্রেরির ওই চিপা মতন ছোট জায়গায় কোনো মানুষ থাকার কথা না। হঠাৎ দেখে হয়তো ভয় পেয়েছে!
পাশ থেকে শুনলাম আরেকজন বলছে, "What is she doing ?" একদল উৎসুক ভিনদেশী স্টুডেন্ট আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমার নামাজের খুশুর অবস্থাটা চিন্তা করেন তখন! পরক্ষণেই তারা যার যার পথে হাঁটা ধরলো। শুনলাম তারা যেতে যেতে বলছে, "Is she dead?" আরেকজন পাশ থেকে বললো, "Maybe she is possessed!" Possesed মানে সহজ বাংলায় যাকে বলে "জ্বিনের আসর"।
নামাজ শেষে সালাম ফিরিয়ে বুকে হাত দিয়ে দেখি হৃদপিণ্ড লাফিয়ে যেন গলা পর্যন্ত উঠে এসেছে! ঠিক ওই মুহুর্তে আমার অন্তরের ভিতর যে কী চলছিল সেটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। আমি ভাবছি, আল্লাহ তো আমার জন্যে পুরো দুনিয়াকে জায়নামাজ করে দিয়েছেন। কেন আল্লাহর ভূমিতে নামাজ পড়তে আমাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে? আরও মায়া লাগছিল ঐ ভিনদেশী মেয়েগুলোর জন্যে। তারা হয়তো আগে কখনো কোন মুসলিমকে স্বচক্ষে দেখেনি। নামাজ পড়া যে কি জিনিস সেটাই হয়তো তারা জানে না! ওরা কি নিজেদের রবকে না চিনে এভাবেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিবে?
ক্যাম্পাসের এই টগবগে তরুণ সমাজ নিয়ে আমার অনেক কিছু করতে ইচ্ছা হতো! ভাবতাম, ইশ! এদের সবাইকে ধরে ধরে যদি আল্লাহর কালাম শুনাতে পারতাম! এই ট্যালেন্টেড তরুণ-তরুণীদের পজিটিভ এনার্জিটা যদি আল্লাহর দ্বীনের কাজে কোনভাবে লাগিয়ে দেওয়া যেত!
খুব অনুভব করতাম যে, আমাদের ক্যাম্পাসে মুসলিমদের একটা প্লাটফর্ম লাগবে। যেখান থেকে সিস্টেমেটিক ভাবে আমরা নিজেরাও একত্রিত হবার একটা স্পেস পাবো এবং সেই স্পেসের সদ্ব্যবহার করে মানুষকেও ইসলাম সম্পর্কে জানাবো ইনশাআল্লহ। কিন্তু, আমি একা একা কীভাবে এতকিছু করবো? তখন থেকেই "ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস" দিয়ে মুসলিম বোনদেরকে খুঁজতে লাগলাম। মসজিদে, কুরআনের কোন মজলিশে, ঈদের দাওয়াতে, কোন বাঙ্গালী আন্টির বাসায়—এক দরজা থেকে আরেক দরজায় আমার দ্বীনের সাথী খুঁজতে লাগলাম। আল্লাহর এই শহরে এত হাজার হাজার মানুষের মধ্যে কেউই কি নেই যে কিনা আমার সাথে এই উদ্যাগে হাত ধরবে?
আলহামদুলিল্লাহ খুঁজতে খুঁজতে এক ঈদের দাওয়াতে আল্লাহ মিলিয়ে দিলেন আমার বেস্ট ফ্রেন্ডকে! সেও তখন নতুন নতুন দ্বীন বুঝতে শুরু করেছে এবং আমার ভার্সিটিতেই পড়ে। ব্যস! আমরা অল্প সময়েই খুব ভালো বান্ধবী হয়ে গেলাম। আমরা দুইজনের কেউই হয়তো অত পারদর্শী না। তবে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আমাদের অন্তরের ভালোবাসাটুকু অকৃত্রিম এবং সেই দ্বীনের আলো ছড়িয়ে মিথ্যাকে পরাজিত করার স্বপ্ন আমাদের দুইজনের চোখেই তখন জ্বলজ্বল করছে!
দুইজন মিলে মিটিংএ বসলাম। ভার্সিটির ওয়েবসাইট চেক করে দেখলাম যে, অন্য ধর্মের স্টুডেন্টদের বড় বড় ছাত্র সংগঠন আছে, যেমনঃ "Christian Student Organization", "Jewish Alliance" ইত্যাদি ইত্যাদি। ওরা অফিশিয়াল স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশান হিসেবে ক্যাম্পাস থেকেই Prayer Service রিকুয়েস্ট করতে পারে! আর আমি কিনা চিপায়-চুপায় নামাজ পড়ে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন খেতাব কুড়াচ্ছি! পুরো ক্যাম্পাস ওয়েবসাইট জুড়ে মুসলিমদের কোন নাম-গন্ধও নেই। এটা আমরা মানতে পারলাম না, এত বড় একটা ভার্সিটিতে ইসলামের কোন নাম-নিশানা কেন থাকবে না?
ক্যাম্পাসে একটা মুসলিম অর্গানাইজেশান খুলতে কী কী প্রয়োজন হয়? ঘাঁটাঘাঁটি করে দুই বোন-বান্ধবী মিলে মোটামুটি একটা লিস্ট দাঁড় করিয়ে ফেললামঃ
- আমাদের লাগবে একজন প্রফেসর যিনি অর্গানাইজেশানের এডভাইসার হিসেবে থাকবেন
- কমপক্ষে ৪ জন স্টুডেন্ট লিডার যারা অর্গানাইজেশানের বোর্ড অফ ডিরেক্টর হিসেবে থাকবে
- অর্গানাইজেশানের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা একটি রচনা
- প্রয়োজনীয় ফর্ম পূরণ করে সকল ডকুমেন্ট নির্ধারিত অফিসে জমা দেওয়া
ফর্ম না হয় পূরণ করলাম, কিন্তু এই লিডার আর এডভাইসরদেরকে আমরা কই পাবো? আমরা হাল ছাড়লাম না! ভার্সিটির প্রফেসর ডিরেক্টরিতে সার্চ দিলাম। খুঁজতে খুঁজতে এক গণিতের প্রফেসরকে পাওয়া গেল যার নাম ডাঃ আলী! আল্লাহু আকবার! তার মানে সে মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহর নাম নিয়ে তাকে আমরা একটা ইমেইল পাঠালাম। তিনি প্রায় সাথে সাথেই রিপ্লাই দিলেন এবং আমাদেরকে খুব উৎসাহ দিয়ে বললেন, তিনি আমাদের মুসলিম অর্গানাইজেশানের জন্যে সবরকমের সাপোর্ট দিবেন! আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ কত মহান!
তবে কাজ তখনও অনেক বাকি! চারজন স্টুডেন্ট লিডার খুঁজতে হবে! আমার বান্ধবী এক বুদ্ধি করল। কিছু কী-ওয়ার্ড দিয়ে ফেসবুকে সার্চ দিল। ওমাহ! আলহামদুলিল্লাহ আমরা আমাদের এই শহরেই আরও ৩ জন মিশরীয় মুসলিম বোন আর একজন লেবানিজ বোনকে খুঁজে পেলাম। দেখলাম যে তাদের কেউ কেউ এই ভার্সিটিতেই পড়ছে আবার কেউ গ্রাজুয়েশান করে বের হয়ে গেছে। তাদেরকে মেসেজ পাঠালে তারাও খুব উৎসাহের সাথে আমাদেরকে সাহস দিল যে, "আরেহ! আমরাও বেশ অনেকদিন ধরেই ক্যাম্পাসে এরকম একটা অর্গানাইজেশন সাজানোর প্ল্যান করছি! কোথায় ছিলে তোমরা এতদিন!?!"
সুবহানআল্লহ এর পর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি! সব লিডার আর প্রফেসর মিলে আমরা ফর্ম পূরণ করে সব ফর্মালিটি শেষ করে কাগজ-পত্র জমা দিয়ে দিলাম! আলহামদুলিল্লাহ কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের মুসলিম অর্গানাইজেশান ক্যাম্পাসে চালু হয়ে গেল।
তখন গুরু দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল! আলহামদুলিল্লাহ আমরা একটা আস্ত রুম পেলাম নামাজ পড়ার জন্যে! প্রথম যেদিন কারো পায়ের আওয়াজের ভয় ছাড়া নিভৃতে, শান্তিতে, নিঃশব্দে নামাজ পড়তে পেরেছিলাম, চোখে মুখে ছিল আনন্দের পানি! শুধু নামাজের ঘরই না, আমরা পেয়ে গেলাম মুসলিম বোনেদের ছোট একটা সৈন্যদল।আমরা নিয়মিত দাওয়াহ টেবিলের আয়োজন করতাম। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় আমরা টেবিল বসিয়ে মানুষকে ইসলাম সম্পর্কে জানাতাম। কিছু বই থাকতো, লিফলেট থাকতো। ইসলামিক ডেকোরেশান পিস, জায়নামাজ, হিজাব ইত্যাদি থাকতো। ইসলামের বেসিক তথ্যগুলো দিয়ে পোস্টার বানিয়ে ডিসপ্লে করতাম। স্টুডেন্টদেরকে টেবিল পর্যন্ত আনতে চকলেট- ক্যান্ডি ইত্যাদিও রাখতাম।
যুবসমাজের কঠিন বাস্তবতাগুলো বুঝতে শুরু করলাম। এমন অনেক স্টুডেন্ট আমাদের টেবিলে আসত, যাদের হয়তো বাবা মুসলিম, কিন্তু মা খ্রিস্টান। তারা তাদের বাবার ধর্ম সম্পর্কে জানতে চায়। আবার এমনও অনেকে আছে যারা মুসলিম পরিবারে বড় হয়েছে, কিন্তু নিজেকে "মুসলিম" হিসেবে পরিচয় দিতে ভয় পায়! আবার অনেকে বলে, "আমি বাবা-মার সাথে নামাজ পড়ি ঠিকই। কিন্তু মনে মনে আমি আদৌ মুসলিম কি না ঠিক জানি না!"
সুবহানআল্লাহ! আমরা তাদেরকে মন খুলে কথা বলতে দিতাম। তাদের নিজেদের সাথে যুদ্ধের এই কথাগুলো শোনার যে আর কোন মানুষ নেই। আমরা বড় বোন হিসেবে তাদেরকে সাহস এবং গাইডলাইন দিবার চেষ্টা করতাম সত্যের পথে ফিরে আসার। আমাদেরকে এভাবে ইসলাম নিয়ে টেবিল সাজাতে দেখে তারা অনুপ্রাণিত হত। এই অর্গানাইজেশন থেকে আমাদের বোনেদের হালাকাহ গ্রুপ চালু হয় মাসজিদে। পরবর্তীতে আমরা অনেক খুঁজে একজন চক্ষু- শীতলতাকারী উস্তাদা খুঁজে পাই, যার কাছ থেকে ট্রেনিং নিবার জন্যে সারা দিন ক্লাসে শেষ করে আমরা চাতক পাখির মত বসে থাকতাম।
যেই ২০০ স্টুডেন্ট এর অডিটোরিয়ামে আমি একমাত্র মুসলিম হয়ে বসে থাকতে অস্বস্তি বোধ করতাম, সেই একই হলরুম ভাড়া করে আমরা আমাদের "সিগনেচার দাওয়াহ ইভেন্ট" করলাম। আমাদের লোকাল মসজিদের ইমামকে স্পিকার হিসেবে নিয়ে আসলাম। তিনি দুই ঘণ্টা ধরে ক্যাম্পাসের ননমুসলিম স্টুডেন্টদের ইসলাম সম্পর্কে যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দিলেন! ২০০ স্টুডেন্টকে সেদিন আমরা ইসলামের কথা শুনিয়েছিলাম আল্লাহর হুকুমে!
প্রতিটা ইভেন্টের সাথে জড়িয়ে আছে অনেক পরিশ্রম, মেধা এবং আত্মত্যাগের গল্প! সেগুলো লিখতে গেলে রাত পাড় হয়ে যাবে! আমি আর আমার বোনেরা পদে পদে নানা বাঁধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছি। আমরা সমাধানের আশায় দরজায় দরজায় ঘুরেছি। আমাদের রব একটি দরজা বন্ধ করে দিলে আরও পাঁচটি দরজা খুলে দিয়েছেন! আমরা থামিনি আলহামদুলিল্লাহ!
ভার্সিটি জীবনের শেষের দিকে আমাদের অর্গানাইজেশানকে ক্যাম্পাসজুড়ে মোটামুটি সবাই চিনতো। আমাদের দাওয়াহ ইভেন্টেও অনেক মানুষ হতো আলহামদুলিল্লাহ। ২০১৭ সালে ভার্সিটি গ্রাজুয়েশানের সময় আমাদেরকে "Presidential Leadership Award" দেওয়া হয় অর্গানাইজেশানের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে পজিটিভ পরিবর্তন আনার জন্যে।
চেয়েছিলাম এক টুকরো সিজদার জায়গা! আল্লাহ কোথায় তুলে সম্মান দিলেন এই অযোগ্য বান্দাকে! অদ্ভুত আশ্চর্য দয়াবান আমাদের রব!
আল্লাহর কসম এক পা আগানোর ক্ষমতা নেই আমাদের আল্লাহর সাহায্য ছাড়া। নব্য দ্বীনে ফেরত আমরা তরুণ-তরুণীরা অনেকেই দ্বীন মানতে এসে নানা জায়গায় হোঁচট খাই। ভয় পাই। আপন মানুষদের প্রেশারে ভীষণ মানসিক চাপের মধ্যে থাকি। পর্যাপ্ত গাইডলাইনের অভাবে দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে কেউ কেউ হতাশার অতল গহবরে নিমজ্জিত হয়ে যাই। দ্বীন থেকে দূরে আছেন যে ভাইবোনেরা, তারা একটু বাঁচার জন্যে খড়কুটোর মত ধরতে থাকি মাদক, পর্ণ এবং হারাম সম্পর্কের মিথ্যা মায়াকে। কেউ বা হাল ছেড়ে দিয়ে নিজের জীবনটাকেই আর রাখতে চাই না! জাহান্নাম অবধারিত জেনেও ফ্যানে ওড়না বেঁধে, গলায় পেঁচিয়ে ঝুলে পড়ি।
যুবসমাজের সমস্যার শেষ নেই। কিন্তু সমাধান আমরা যতটা কঠিন মনে করি, সেটা ততটাও কমপ্লিকেটেড না! এই প্রতিটা সমস্যার সমাধান নিচের কয়েকটি পয়েন্টে কনডেন্স করে ফেলা যায়ঃ
১। ভালো বন্ধু ঈমানের অক্সিজেনঃ ক্ষুধার্ত প্রাণী যেভাবে হন্যে হয়ে খাবার খুঁজে, সেভাবে আমাদেরকে হন্যে হয়ে দ্বীনদার বন্ধু-বান্ধবী খুঁজে বেড়াতে হবে। এরাই আল্লাহর পথে হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেলে আপনাকে উপরে তুলবে। হারাম সম্পর্ক বা পর্ণের ভূত মাথা থেকে এক বকা দিয়ে ঝেটিয়ে বিদায় করবে। বৈরী পরিবেশে দ্বীন নিয়ে চলার সময় আল্লাহ দ্বীনদার বোনেদের সঙ্গ দিয়েই আমাকে শক্তিশালী করেছেন আলহামদুলিল্লাহ।
রসূল (স.) বলেন, “একজন মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম অনুসরণ করে; সুতরাং প্রত্যেককে বিবেচনা করা উচিত যে সে কে তার বন্ধু বানিয়েছে।”(আবু দাউদ){iiSuccess}
২। উত্তম উস্তাদ/উস্তাদাঃ আমার এক প্রিয় শেইখ বলছিলেন যে, "জীবনে দুই প্রকার মা-বাবা লাগে! একপ্রকার হচ্ছে তোমার জন্মদাতা বায়োলজিক্যাল মা-বাবা এবং আরেক প্রকার হচ্ছে তোমার দ্বীনের উস্তাদ/উস্তাদা—তারা তোমার স্পিরিচুয়াল মা-বাবা! দুইপ্রকার মা-বাবা ছাড়াই জীবন অকল্পনীয়!" সেজন্যে খুঁজে বের করতে হবে একজন দ্বীনি জ্ঞান-সম্পন্ন কোয়ালিফাইড উস্তাদ।
আপনার দ্বীনি বান্ধবী হয়তো আপনার সাথে ম্যাচিং করে নিকাব পরবে, কিন্তু সেই নিকাবে ময়লা পড়ে অজু ভেঙ্গে গেল কি না—সেই মাসআলা দিবার যোগ্যতা কিন্তু সবার নেই। যার জ্ঞান, আদব এবং আখলাক আপনাকে মুগ্ধ করবে এমন একজন উস্তাদ/উস্তাদা যুবক-যুবতীদের মেন্টর হিসেবে বড় বেশী প্রয়োজন। "আমি এমন কোন উস্তাদকে চিনি না" এই অজুহাত দিলে চলবে না। ভর্তি পরীক্ষার সময় আমরা বেস্ট কোচিং সেন্টার আর স্যার-ম্যাডামদেরকে দুনিয়া ঘেঁটে খুঁজে খুঁজে বের করে ফেলি না? ঘরে বসে কেউ কিন্তু বলি না যে, "এমন টিচারকে তো আমি চিনিনা!" ঠিক সেভাবেই দ্বীনের উস্তাদ/উস্তাদাদের আন্তরিকভাবে খুঁজলেই পাওয়া যাবে ইনশাআল্লহ। এখন দেশে বেশ কিছু ভালো ইসলামিক অনলাইন লার্নিং প্লাটফর্ম হয়েছে। এরকম একটা সিস্টেমের মধ্যে ঢুকে যারা তাদের স্পিরিচুয়াল বাবা-মাদের খুঁজে পেরেছেন, তাদেরকে অভিনন্দন!
৩। দ্বীনের কাজের জন্যে মাঠে নামতে হবে। যতই ফেসবুক, টুইটারে কী-বোর্ড যুদ্ধ চালাই, ফিল্ডে না নামা পর্যন্ত আমরা জীবনের অনেক কঠিন বাস্তবতাই বুঝবো না। সোশাল মিডিয়াতে পোস্ট পড়ে বা লিখে যুবসমাজের কার্যকরী পরিবর্তন আসবে না। ঘাম ঝরাতে হবে!
অল্প পরিসরে নিজের ভার্সিটি ক্যাম্পাসে অথবা পরিবারের মানুষদের দিয়েই সে যাত্রা শুরু হোক। আপনি পরিবারের ৩-৪ টা বাচ্চাকে জড়ো করে আলিফ, বা-তা শেখান। আপনার বয়স্ক মাকে বাসন ধুতে ধুতে বিদআতের সংজ্ঞাটা ভালো ভাবে বুঝিয়ে দিন। যেই ভাইবোনেরা এখনও হন্যে হয়ে দ্বীনি সঙ্গ এবং উস্তাদ/উস্তাদা খুঁজছে, তাদেরকে গাইড করুন। আপনি না করলে তাদের পাশে কে দাঁড়াবে বলুন?
৪। বাক্সের বাইরে চিন্তা করতে হবে। দ্বীন মানতে পরিবার-সমাজ বাঁধা দিচ্ছে বলে আমরা বিষণ্ণ মনে, হাত গুটিয়ে বসে পড়লে তার সমাধান হবে না। প্রয়োজনে দ্বীনের জন্যে নিজ হাতে পরিবেশ তৈরী করে নিব রবের সাহায্যে! দেখুন, ক্যাম্পাসে এক অর্গানাইজেশান দাঁড় করাতে গিয়ে আমাদেরকে কতগুলো রোড-ব্লকের সম্মুখীন হতে হয়েছে। একের পর এক বাঁধা অতিক্রম করার সময় আমাদেরকে "বাক্সের বাইরে চিন্তা" করে আইডিয়াগুলো বের করতে হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ!
আমাদের তরুণদের চিন্তার পরিধি আরও অনেক বাড়াতে হবে, দ্বীন থেকে শক্তি সঞ্চারিত করে কাজে লেগে পড়তে হবে। দেখেবন যে, কল্যাণ এবং বারাকাহর কাজে এমনভাবে লেগে যাচ্ছেন যে সময় নষ্ট করার মত সময়ই আপনার হাতে নেই! কীসের নেট-আসক্তি, টিভি-মিউজিক আর বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ডদের ঝামেলা?! আল্লাহর পথে দৃঢ় তরুণদের হাতে এত অযথা সময় আছে? শয়তানও যেন তাদের দেখে দৌড়ে পালায়! আমিন!
ভাই/বোন শুনুন! যখন আল্লাহর জন্যে কিছু করবেন, কখনই সামনে আগাতে ভয় পাবেন না! আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না আল্লাহ কীভাবে আপনার যৌবনকে আরও শক্তিশালী এবং কল্যাণকর করবেন! দ্বীন মানতে ক্রমাগত হোঁচট খাচ্ছেন যারা, তাদেরকে বলছি, "আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে! আল্লাহর দিকে এক পা আগালে আল্লাহ দশ পা দিয়ে আমাদের দিকে দৌড়ে আসবেন (১)। কিন্তু ঐ এক পা আমাদেরকে প্রথমে আগাতে হবে!
দ্বীনে ফেরত আমাদের ভীষণ ট্যালেন্টেড এবং উদ্যামী তরুণ ভাই-বোনেদেরকে বলছি—ইসলামের আলোর মশাল তো তোমার হাতেই! তুমি তোমার আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি আর সামর্থ্যের গুরুত্ব বুঝে সেই আলো ছড়িয়ে দাও উম্মাহর ঘরে ঘরে! রব্বে কারীম যেন আমাদের সকলকে কবুল করেন।
আমিন।
রেফারেন্সঃ
১। ‘আমি আমার বান্দার সঙ্গে আমার প্রতি ধারণা অনুযায়ী ব্যবহার করি। যখন সে আমাকে স্মরণ তখন আমি তার সঙ্গে থাকি। অনন্তর যদি সে আমাকে মনে মনে স্মরণ করে আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। আর যদি সে কোনো মাহফিলে আমার স্মরণ করে, তবে আমি তার চেয়ে উত্তম মাহফিলে (নিষ্পাপ ফেরেশতাদের মাহফিলে) তার স্মরণ করি। সে যদি আমার দিকে এক বিঘৎ অগ্রসর হয়, তবে আমি তার দিকে এক হাত (দুই বিঘৎ) অগ্রসর হই। আর সে যদি আমার দিকে একহাত অগ্রসর হয় তবে আমি তার দিকে একগজ (দুই হাত) অগ্রসর হই। সে যদি আমার দিকে হেঁটে হেঁটে আসে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।’ (বুখারি, মুসলিম)
শারিন সফি অদ্রিতা{iiWriter}
সর্বশেষ সংস্করনঃ 2022-09-11T12:09:58+06:00
