You must enable JavaScript to see this text. ফিরে এসো স্বধর্মে - Ilmul Islam - ইলমুল ইসলাম।

বুকমার্কে যোগ করা হয়েছে।
বুকমার্ক থেকে রিমুভ করা হয়েছে।
Site Settings

Site Mode

The system theme automatically adopts to your light/dark mode settings

Site Font Design

Desktop Mode (On/Off)

Fullscreen In Out

Select Language

Select Theme Color

UI Version: 0.1.2

Close drawer

ফিরে এসো স্বধর্মে

avatar
-
( শব্দ) পঠিত 0 মন্তব্য
মায়ের মুখে শুনেছিলাম, আমার জন্ম না কি রমজান মাসে হয়েছিল। আস্তে আস্তে যখন বড় হতে লাগলাম তখন বুঝতে পারলাম আমার জন্ম হয়েছে একটা মর্ডানিজম হিন্দু পরিবারে। মূর্তি নিয়ে খেলতে খেলতে আমার ছোটকাল কেটেছে কিন্তু তখন তো আর এত বেশি কিছু বুঝতামনা যে, এটা আমাদের ইশ্বর হবে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার চিন্তা চেতনার পরিবর্তন শুরু হতে লাগলো। কোনো একদিন মূর্তি নিয়ে খেলতেছিলাম হঠাৎ করে হাত থেকে মূর্তটি পরে ভেঙে গেলো। বাবা সেদিন আমাকে প্রচুর মেরে ছিলেন। মা তখন বলেছিলেন, আরোহ মারো; বেশি করে মারো, কতবার না করেছি-মূর্তি নিয়ে খেলিস না; আমাদের ইশ্বরকে নিয়ে খেলিস না। শুনিস নি তো কথা। আমি তখনো এত বেশি কিছু  বুঝতাম না যে, এই মাটির মূর্তিই আমাদের ইশ্বর হবে। কখনো মায়ের হাতে আবার কখনো বাবার হাতে- এভাবে জীবনে কতবার মার খেয়েছি; শুধু এই মাটির ইশ্বরের জন্য। তা হিসেব মিলাতে পারি না। ইশ্বরকে ভাঙলে মার খেতে হয় এ-ই ভয়ে আর কোনোদিন মূর্তি হাত দিয়ে ধরিনি। সেই ছোটবেলা থেকেই আমার এই মাটির ইশ্বরের প্রতি কোনো আবেগ, মায়া-মহব্বত, সম্মান কাজ করতো না। মা যখন ভোর সকালে উঠে উলুলু শব্দ করতেন তখন আমার বিতৃষ্ণা লাগতো। পৃথিবীতে কতরকম শব্দ আছে সেগুলো করুক না, এটাই কেন করতে হবে। কেমন যেন ছোট থেকেই আমার ধর্মের প্রতি এরকম একটা স্বভাব তৈরি হয়েছিলো-আমি যখন বড় হতে শুরু করলাম তখন একটু একটু বুঝতে পারছিলাম। সত্যি বলতে আমার এসব একটুও ভালো লাগছিলো না। নিজের মতো করে মানিয়ে নিতে পারছিলাম না। ছোট থেকেই আমার মনে কেমন যেন প্রশ্ন জাগতো- এই মূর্তি তো আম্মুই তৈরি করেছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি। তৈরি করা জিনিস আবার ইশ্বর হয় কিভাবে। যে নিজে নড়তে পারেন না সে এই বিশাল পৃথিবী চালাবে কি করে? হাতের বানানো মূর্তি কখনো ইশ্বর হতে পারে না। ইশ্বর অন্য কেউ আছেন, যে এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই চালাচ্ছেন। 

-আমি আমার আব্বু আম্মুর শেষ সন্তান ছিলাম। তাই সবাই আমাকে একটু বেশি আদর করতো। আমি যখন ক্লাস সেভেনে উঠলাম তখন আমার এক বন্ধু রাশেদ আমাকে আমার জন্মদিনে একটা বই উপহার দিয়েছিলো। বইটা ছিলো ধর্মীয়। ইসলাম ধর্মের। তখনো জানতাম না ইসলাম ধর্ম বলতে কিছু একটা  আছে। বই পড়ুয়া পাগল ছিলাম বলে সেদিন রাতেই বইটা পড়ে শেষ করলাম। তেমন কিছু বুঝলাম না। কিন্তু যেদিন শুনলাম আমাদের পাশের বাসার জুঁই আপু একজন মুসলমান ছেলের সাথে পালিয়ে বিয়ে করেছেন তখন থেকে যেন মুসলমান শব্দের সাথে এই প্রথম আমি পরিচিতি হলাম। শুনেছিলাম, জুঁই আপু মুসলমান হওয়ার জন্যই ঐ ছেলের সাথে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন। 

-আমার মা বললেন, ছিঃ ছিঃ। আমাদের ধর্মটাকে এক্কেবারে সর্বনাশ করে দিলো। এত এত হিন্দু থাকতে মুসলমান ছেলের সাথে পালিয়ে যেতে হয়। আমাদের ধর্মটাকে সম্মানহানি করলো মেয়েটা। বেঁচে থাকলে এসবও দেখতে হয়। অথচ আম্মু যে একজন খ্রীষ্টানকে বিয়ে করেছেন তার কোনো খেয়াল নেই।

-আমি বুঝলাম না। কেউ অন্য ধর্মে চলে গেলে আরেক ধর্মের মানসম্মান কিভাবে কমে। তাই ইসলাম সম্পর্কে ঘাটাঘাটি শুরু করলাম। রাশেদের দেওয়া বইটা বার বার পড়ে ইসলাম সম্পর্কে আমার মোটামুটি ভালো ধারণা তৈরি হলো। এই প্রথম ইসলাম ধর্মের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) সম্পর্কে জানলাম। কেমন যেন একটু শীতলতা অনুভব করলাম। সকালে স্কুলে গিয়ে রাশেদকে বললাম, আর কি কোনো বই আছে তোর কাছে? তোদের ইসলাম সম্পর্কে ভালোভাবে জানার খুব ইচ্ছে হলো আমার।

-অবশ্যই আছে। তোকে এসব বই দিলে, তোর আম্মু যদি মাইন্ড করে। তাহলে কিন্তু তোর অনেক সমস্যা হবে।

-'ও নিয়ে তুই ভাবিস না।' আমার তোদের ধর্ম সম্পর্কে খুব জানার ইচ্ছা। তুই ও তো এতকিছু বলস না।

-আসলে স্কুলের পড়াশুনা করেই সময় পায় না তাই ধর্মীয় গ্রন্থ তেমন পড়া হয় না। আচ্ছা, কালকে তাহলে তোকে আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআন তোকে দিবো। আমার কাছে তাফসির আছে। এটা সময় নিয়ে পড়লে তুই পূর্নাঙ্গ একটা ধারণা পাবি।

-তাফসির কি?

-কোরআনের প্রত্যেক আয়াতের ব্যাখ্যা। তোর আগ্রহ দেখেই বুঝতে পারতেসি। তুই একটু পড়লেই বুঝতে পারবি। তবে সাবধান, আনটি যেন টের না পায়।

-'ও নিয়ে তুই চিন্তা করিস না।' আমার রুমে কেউ আসে না।

পরের দিন সকালে গিয়েই রাশেদের কাছে থেকে কোরআনের তাফসির নিলাম। এত সুন্দর, বাহ! আজ আর স্কুল করা হলো না। প্রায় টানা ছয় মাস সময় লাগলো শেষ করতে। এর মাঝে প্রায় আম্মুর কাছে ধরাই খেয়েছিলাম। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়েছেন। এত কিছু জানার পরও একজন হিন্দু হয়েও আমার 'আল্লাহ' শব্দ বলতে গলায় বাঁধে কারণ আমি তো পবিত্র নয়।

 আমার এই ছোট বয়সে-ইসলাম নিয়ে এত বেশিই  পড়াশোনা করেছিলাম যে, প্রত্যেকটা বিষয়ের পরতে পরতে আমার জ্ঞান অর্জন হয়েছিলো। কিন্তু কখনো আমার পরিবারকে তা বুঝতে দেয় নি। আমার মা অনেক বুদ্ধিমতী ছিলো। সে একটু একটু করে মনে হয় কিছুটা টের পাচ্ছিলো। কারণ আমি স্কুলে তেমন ভালো রেজাল্ট করতে পাচ্ছিলাম না। তিনি আমাকে একটু সন্দেহেও করলেন। কিন্তু আমি এত কিছু পড়লেও, জানলেও কখনো নিজেকে জাহির করতাম না। কখনো বাবা-মাকে বুঝতে দিতাম না। কখনো দু’রাকাআত নামায পড়ার চেষ্টা করতাম না, কিন্তু মাঝে মাঝে উপোস থাকতাম এটা আমাদের হিন্দু ধর্মের কারণে- তবে নিয়ত করতাম এইভাবে, "আজকের এই উপোসটা ভগবানের জন্য নয়, আমার আল্লাহর জন্য।"

এভাবে চলতে থাকলো আমার জীবনের দিন, মাস, বছর। আস্তে আস্তে আমার স্কুল জীবন শেষ হয়ে গেলো। খুব ভালো রেজাল্ট করলাম। বাবা-মা ও পরিবারের সবাই খুশি হলো। রেজাল্ট ভালো করার সুবাদে একটা সুযোগ পেলাম। তাই ভাবলাম, এই সুযোগ অবশ্যই আমার হাত ছাড়া করা যাবে না।

অবশেষে আবদার করে বাবা-মাকে বললাম, এই গ্রামে আমি আর পড়াশোনা করতে চাই না। এখানে ভালো শিক্ষক নেই, আর্দশ টিউটর নেই, নামকরা কলেজ নেই। আমি শহরে যেতে চাই। শহরে পড়াশোনা করলে আমার আরোহ বেশি উন্নতি হবে।

-মা বললেন, শহরে গেলে তুই নষ্ট হয়ে যাবি। বাড়িতেই ধর্ম-কর্ম করিস না। শহরে গেলে তো একদমই ধর্ম-কর্মের কথা ভুলে যাবি।

-দেখো মা। তুমি শুধু আমার উপর বার বার ধর্ম চাপিয়ে দাও। তোমার ধর্ম-কর্ম তুমি করো। আমার এসব ভালো লাগে না।

-ছিঃছিঃ এ কেমন কথা। ভগবান তোকে বুঝ দান করুক। দেখলে তোমার ছেলে কি বললো? এরপরেও কি তুমি ওকে শহরে পাঠাতে চাও। আমি কিন্তু ওর লক্ষণ ভালো দেখতেছি না।

- দেখো রিয়া, তুমি সব সময় এক লাইন বেশি বুঝো। ও, এখনো ছোট মানুষ। ও, ধর্ম সম্পর্কে কি বুঝবে? তুমি ওর উপর বিশ্বাস রাখো, ও কখনো তোমার বিশ্বাস নষ্ট করবে না। শুধু শুধু ছেলে-মেয়েদের সন্দেহ করো।

-হুমম। তাই যেন হয়। ওর মতিগতি আমার ভালো লাগে না; তাই বললাম। আমি চাই না, ওর জন্য আমাদের দূর্নাম হোক, সম্মান নষ্ট হোক, মানুষ আমাদের খারাপ বলুক, টিটকিরি দিক। এমনিই তেমাকে বিয়ে করে- আমাদের ধর্মটাকে ছোট করেছি।

-দেখো রিয়া, সবসময় ধর্ম ধর্ম করে আমাকে ছোট করবে না। কখনো তো তোমাকে আমার ধর্মের কথা বলি নাই। আমি তোমাকে ভালোবাসে বিয়ে করেছি-তোমার ধর্মকে নয়। তুমি তোমারটা পালন করো আমি আমারটা পালন করি।

আমি মনে মনে ভাবলাম, আমার ব্যাপারে মা কি সব জেনে গেছে না কি? আমি যে চুরি করে ইসলামিক বই, কিতাব পড়ি এসব দেখেছে না কি? হঠাৎ করে বাবার ডাকে 'চমকে উঠলাম।'

-রিফাত। 

-জ্বি বাবা! 

-তোর উপর আমার অনেক বিশ্বাস আছে। মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করবি। সময় নষ্ট করবি না। নিজের ভালো কখনো অন্যকে বুঝাতে দিস না। তোর ভালো তোকেই বুঝে বাস্তবতায় চলতে হবে। পারিবারের কথা খেয়াল রাখিস। বিশেষ করে, তোর মা সবসময় তোকে নিয়ে আজেবাজে চিন্তা করে। মা বাবা সবসময় চাই ছেলেমেয়েরা সুখে থাকুক, ভালো থাকুক। আমরাও চাই তুই সুখে থাক, ভালো থাক। পাশাপাশি নিজেকে নিজের মতো করে গড়ে তুলে আমাদের সম্মান রক্ষা করিস।

আমি বললাম, বাবা তাই হবে। আমাকে নিয়ে একদম তোমাদের চিন্তা করতে হবে না।

আমার সমস্ত কাপড়চোপড়, ব্যাগ এবং বই মা গুছিয়ে দিচ্ছেন আর কাঁদতেছেন। মা বললেন, তোকে ছাড়া আমাকে এভাবে একা থাকতে হবে তা কখনো ভাবিনি। মাকে, কাছে টেনে নিয়ে চুমু দিয়ে বললাম-এত চিন্তা কিসের মা! শুধু দোয়া করো। তোমার ছেলে সবসময়ই তোমার পাশেই থাকবে। ভালোবাসি তোমাকে মা।

পরেরদিন সকালেই চলে আসলাম শহরে। জীবনে এই প্রথমবার শহরে আসলাম। এর আগে আর কখনো আসা হয়নি। আমাদের অঞ্চলের অনেকেই এই শহরে থাকে। তাই আগে থেকেই চিন্তা করে নিলাম- আমার খুব হিসাব করে পা ফেলতে হবে। নিজের পরিচয় গোপন করে সবার সাথে মিলেমিশে চলতে হবে। শহরে এসে যেন শান্তি পেলাম। এ শান্তি যেন স্বাধীনতার শান্তি, মনের শান্তি, প্রাণের স্পন্দন। নতুন করে আবার বাঁচার উদ্দীপনা পেলাম। এবার নতুন করে আমার জীবনটাকে সাজাতে পারবো। মায়ের সন্দেহ থেকে একদম বেঁচে থাকা যাবে। মা একটুও বুঝার চেষ্টা করে না-যখন তখন বিরক্ত করে ফেলে; যেখানে আমি শান্তি পায়, তৃপ্ত আসে, মনের প্রাপ্তিতা মিলে সেখানে যেতে চাই কিন্তু যেতে দেয় না। মা কে সত্যিই অনেক ভালোবাসি তবে মায়ের এরকম বিরক্ত আমার একদম ভালো লাগে না।

- আর দেরি করা ঠিক হবে না। অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে আমার জীবন থেকে। আর সময় নষ্ট করতে চাই না। মুসলমান হতে হবে। নয়তো আমল করেও কোনো লাভ হবে না। আগে কালেমা পড়ে মুসলমান হতে হবে। তাই সুন্দর মতোন গোসল করে এশারের নামাযের সময় মসজিদে গেলাম কিন্তু নামায পড়লাম না- কারণ আমি তো এখনো হিন্দুই আছি।

হজুর নামায পড়ে বের হচ্ছেন, এমন সময় আমি....

-আসসালামু আলাইকুম। 

-ওয়ালাইকুম আসসালাম। (হুজুর) 

- হুজুর, আপনার সাথে কি একটু পারসোনালি কথা বলতে পারি?

-অবশ্যই। (হুজুর) 

হুজুর আমাকে তার হোজরাতে নিয়ে গেলেন। আহ! কি সুন্দর- বর্নণাবিহীন সৌন্দর্য হুজুরের হোজরা। দেয়ালে টাঙানো কাবা শরীফ আর রসুলুল্লাহ (সঃ) এর রওজা শরীফ। এসব দেখতে দেখতে কখন যেন আমার চোখে পানি এসে গেলো; একটুও বুঝতে পারলাম না। মনে মনে বললাম আহা কত সুন্দর হুজুরদের জীবন! আর আমরা কি করতেছি। আমার মতো যারা বিধর্মী তারা কি করতেছে? আমি ধর্ম নিয়ে এত ঘাটাঘাটি করেছি বলেই আল্লাহ আমাকে সুপথ দেখিয়েছেন। আমি সঠিক পথ খুঁজেছি বলেই আল্লাহ আমাকে সুপথ দেখিয়েছেন। 

হুজুর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কোরআনের একটা আয়াত তেলাওয়াত করলেন, "হে বিশ্বাসীগণ তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর এবং তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করোনা।" (সূরা আল ইমরান- ৩:১০২)

-হুজুরকে আমার জীবনের সব কথা খুলে বললাম। আরোহ বললাম, আমি আপনার কাছে মুসলমান হতে এসেছি।

- তখন হুজুর বললেন, বাবা তোমাকে দেখে অনকটা  ছোট মনে হয়তেছে। তুমি একজন হিন্দু পরিবারের সন্তান। মুসলমান হতে এসেছো 'আলহামদুলিল্লাহ।' কিন্তু তোমার পরিবার কি এসব মেনে নিবে?

-হুজুর, আমার পরিবার মেনে নিবে না নিবে এসব ভেবে আমি আল্লাহর কাছে মাথা নত করছি না। আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং সঠিক জ্ঞান শক্তি আমাকে দিয়েছেন-তাছাড়া আল্লাহ আমাকে ভালো-মন্দ বুঝার শক্তি দিয়েছেন, এই জন্য আমি মুসলমান হতে এসেছি কারণ আমি আমার আল্লাহকে জেনেছি, চিনেছি, বুঝেছি ও উপলব্ধি করেছি তাকে যিনি আমাকে আদর করে, মায়া করে, মহব্বত করে সৃষ্টি করে এই দুনিয়াতে শুধু মাত্র তার এবাদত করার জন্য পাঠিয়েছেন। 

-তুমি এত সুন্দর করে বললে বাবা- আমার মনটা যেন ভরে গেলো। সত্যিই এখন আমার বিশ্বাস হলো তুমি ইসলাম সম্পর্কে খুব ভালো ভাবে জেনেছো। কিন্তু আফসোস হয় আমার ঐসমস্ত মুসলমান ভাই-বোনদের প্রতি যাদের জন্ম একটা মুসলমান ঘরে অথচ তারা পবিত্র কোরআন খুলে দেখে না, কোরআন তেলাওয়াত করে না, হাদিস সম্পর্কে জানার চেষ্টা করে না। বাবা তুমি চিন্তা করো না- আমার বিশ্বাস, মহান-আল্লাহ তাআ'লা তোমাকে এই দুনিয়াতেই পুরষ্কৃত করবেন।

হাত দাও আর কালেমা পড়োঃ لآ اِلَهَ اِلّا اللّهُ مُحَمَّدٌ رَسُوُل اللّهِ  -  "আল্লাহ্ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নাই, মুহাম্মাদ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁহার প্রেরিত রসূল।"

এই কালেমাও পড়ো বাবাঃ اشْهَدُ انْ لّآ اِلهَ اِلَّا اللّهُ وَحْدَه لَا شَرِيْكَ لَه، وَ اَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدً اعَبْدُه وَرَسُولُه  -  "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন উপাস্য নাই। তিনি এক, অদ্বিতীয় এবং আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে, মুহাম্মাদ তাঁহার বান্দা ও প্রেরিত রাসুল।"

এখন থেকে তুমি একজন মুসলমান। 

-হুজুর, মনে মনে আমার একটা ইসলামিক নাম রেখেছিলাম।

-কি নাম বাবা?

-আহমদ। 

-আলহামদুলিল্লাহ। বাহ্! আহমদ, হুজুর (সঃ) এর নাম মোবারক ছিলো। মাশাল্লাহ। আল্লাহ তোমাকে কবুল করুক। এই নাও বাবা খুরমা আর কিছু খেঁজুর।

হুজুর কে সালাম দিয়ে সেখান হতে বিদায় নিলাম। 

আজ আমার সবচেয়ে খুশির দিন। আমি যে আজ এতটা শান্তি পেলাম, আমার আত্মা যে কতটা শান্তি পেলো তা কাউকে বোঝাতে পারবো না। শুধু এতটুকুই বলবো,"যে ব্যক্তি মধু খায় নি সে কি বলতে পারবে মধু মিঠা না কি তিতা; ঠিক তেমনি ইসলামের ছায়াতলে যে আসেনি বা স্বাদ নেয় নি তাকে কিভাবে বুঝাবো এর মজা এরকম না কি সেরকম।"

"সারাটা রাত আল্লাহর এবাদত-বন্দেগী করে কাঁদতে কাঁদতে কাটিয়ে দিলাম।" আল্লাহর মহব্বতে আমার ক্বালব যেন বিগলিত হয়ে গেলো। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম।

গভীর রজনীতে, আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তাআ'লার দরবারে দু'হাত তুলে দোয়া করলাম;"হে পরওয়ারদেগার যতদিন বেঁচে আছি ততদিন যেন দুনিয়ার ফেতনা-ফ্যাসাদ হতে বাঁচতে পারি এবং তোমার ও তোমার হাবিবের হয়ে দুনিয়াতে চলতে পারি।" আল্লাহ আমার দোয়াটুকু কবুল করে নাও।

আজ আমার কলেজের প্রথম দিন। মনটা যেন কেমন কেমন করতেছে। যেভাবেই হোক আমার পরিচয় অবশ্যই গোপন রাখতে হবে। আল্লাহ যদি সহায় থাকেন, তাহলে কেউ আমার ক্ষতি করতে পারবে না।

কলেজে আজ প্রচুর ছেলে-মেয়ে এসেছে। প্রথম দিন তো। তাই মনে হয়।

-আমি ক্লাসের ঠিক পেছনের বেঞ্চে বসে আছি। একটু আনমনা হয়ে। কোনো রেসপন্স নেই আমার। এমন সময় কয়েকজন এসে আমাকে বললো, তোমার নাম কি? 

আমি বললাম, আহমদ। 

"বুকের ভেতর কেমন যেন একটু মুচড়িয়ে ওঠলো। শরীর ঘেমে একাকার হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ এমন সময় আমার শরীর একটু ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠলো। তখন মনে হলো, আমি আর হিন্দু নেই, আমি মুসলমান হয়েছি। আমার নাম আহমদ।"

-বাহ্! খুব সুন্দর নাম তো। আমি আশিক, আর ও নিলয়, তার নাম আকাশ এবং সে হচ্ছে দূর্জয়।

-আমি বললাম, তোমাদের নামগুলোও অনেক সুন্দর। 

আমরা পরিচিত হলাম। কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের সকলের বন্ধুত্ব অনেক গভীরে চলে গেলো। আমি এত তাড়াতাড়ি তাদের এতোটা কাছে চলে যাবো কল্পনায় করতে পারছি না। কলেজের দিনগুলো ভালোই যাচ্ছিলো।

এর মধ্যে আমার বাবা-মা আমার এখানে এসে কয়েকবার ঘুরে গেলেন। আল্লাহর কি রহমত কেউ একটু টেরও পেলনা, যে আমি মুসলমান হয়ে গেছি। তবে তাদের সাথে আমার এমনভাবে ব্যবহার ও কথা বলতে হয়েছে, যেন আমার কোনো পরিবর্তনই হয়নি। যদিও মা একটু সন্দেহের নজরে তাকিয়ে ছিলো। আমি পাত্তা দিতে দেয়নি।

-মা বললেন, এটা কি?

-আমি তো হতভম্ব হয়ে গেলাম। বললাম এটা আতর। আমার না। আমার বন্ধু নিলয়ের।

-না, এইসব আতর-তাটর রুমে রাখবি না। এই যে নে একটা মূর্তি। ভগবানকে সব সময় সাথে রাখবি। দেখবি তোর কেউ আর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

-আমি বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম, দেখ বাবা- মা কিন্তু আবার বাড়াবাড়ি শুরু করে দিয়েছে। এই মাটির ভগবান কি আমাকে রক্ষা করতে পারবে? আমার কথাগুলো শুনে বাবা একটু বিচলিত হয়ে গেলো।

বাবা বললেন, দেখো রিয়া- তুমি এমন করবে তা যদি আগে জানতাম তাহলে তোমার সাথে আমি এখানে আসতাম না। এসেই ভগবান নিয়ে পরে আছো। কতদিন পর ছেলের কাছে এসেছো, একটু আদর-যত্ন করে ভালো-মন্দ খাওয়াবে তা না করে! ওকে ধর্মের দীক্ষা দিতেছো। এসব আর ভাল লাগে না।

আমার বাবার সম্পর্কে একটু না বললেই নয়।

--আমার বাবা একজন খ্রীষ্টান ছিলেন। মাকে প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন। একটু রোমাঞ্চকর মনে হচ্ছে তাই না। হিন্দু-খ্রীষ্টান কিভাবে প্রেম হয়। ভাবতেই অবাক লাগছে তাই না। আসলে প্রেম-ভালোবাসা কোনো জাত-পাত, ধর্ম-কর্ম মানে না। তবে ইসলামে অবৈধভাবে যেকোনো সম্পর্কই হারাম। যাইহোক, আমার বাবা ছিলেন ত্রিতত্ত্বে বিশ্বাসী। এই ইশ্বর নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে মাঝে মাঝে তর্ক বির্তক হতো।তবে সে অনেক ঘটনা। বাবার কাছ থেকে খ্রীষ্টান ধর্ম সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি। ভালোই লাগতো কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হতো বাবা মনে হয় মনগড়া কথা বলতেছেন।

একদিন গল্প শুনতে শুনতে হঠাৎ প্রশ্ন করেছিলাম, তুমি যে এভাবে কথা বলতেছো এসব কি তোমাদের ধর্মীয় গ্রন্থে লেখা আছে। বাবা বললেন, অবশ্যই আছে। তোর বিশ্বাস হচ্ছে না, হচ্ছে বাট....?

আচ্ছা, আমি তোকে বাইবেল এনে দিবো। তোর মা কে আবার এসব বলতে যাস না, সে কিন্তু এসব একদম পছন্দ করবে না। জানিস, আমার খুব কষ্ট হয়। তোর মাকে বিয়ে করার পর থেকে একটা দিনও সে আমাকে গির্জায় যেতে দেয়নি। অথচ তোর মা তাদের  প্রত্যেক উৎসবে আমাকে নিয়ে যেতো কিন্তু তোর মা কে আমি কখনো নিয়ে যেতে পারি নি।

আমি বললাম, এসব আর শুনতে চাই না, অনেক শুনেছি। আমার বিকালে প্রাইভেট আছে। তোমরা থাকতে চাইলে থাকতে পারো আর যদি বাড়িতে চলে যেতে চাও তাহলে যেতে পারো।

বাবা-মা আমার কাছে থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। আমিও প্রাইভেটে যাওয়ার জন্য বের হয়ে রওনা দিলাম।

প্রাইভেটে পড়তে এসে দেখলাম- পরিবেশ থমথমে। ইকবাল স্যারকে অনেক টেনশন দেখাচ্ছে। দূর্জয়, আকাশ আর নিলয়ের মুখ কালো হয়ে গেছে। কারো মুখে কোনো 'টু' পরিমাণ শব্দ নেই। সবাই নীরবে মুখ গোমড়া করে বসে আছে। আমি রুমে ঢুকার আগেই স্যারকে সালাম দিলাম।

-আসসালামু আলাইকুম স্যার। (আমি)

-ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভেতরে আসো আহমদ। 

-আমি ভিতরে আসলাম। সবাই আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে। মনে মনে ভাবলাম, সবাই মনে হয় আমার গোপন পরিচয় পেয়ে গেছে। আমি যে হিন্দু এর প্রমান মনে হয় সবাই পেয়েছে। একটু ভয়ও হলো। তবুও সাহস করে বললাম স্যার কি হয়েছে? সবাই এভাবে চুপচাপ আছে কেন?

এবার সবাই আমার দিকে যেন বিনয়ের দৃষ্টিতে তাকালো। আমি বুঝতে পারলাম, সবাই স্যারকে এই প্রশ্নই করতে চাচ্ছিলো কিন্তু কেউ সাহস পাচ্ছিলো না।

-এবার স্যার মুখ খুললেন;

বললেন, তোমরা সবাই তো আশিক নামের ছেলেটাকে চিনো- তাই না? আশিক খুব ভালো ছাত্র ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে সে পরিবর্তন হয়ে গেছে। তা কি তোমরা জানো?

আমি বললাম, কিসের পরিবর্তন হয়ে গেছে 'স্যার?'

স্যার বললেন, আজ ওর আব্বু আমাকে ফোন দিয়েছিলো। তাকে মাদকাসক্ত নিরাময়ের কেন্দ্রে রেখে এসেছে।

স্যারের এ কথা শুনে, আমি আশ্চর্য হয়ে- দূর্জয়, আকাশ আর নিলয়ের দিকে তাকালাম। ওরা সবাই কেমন যেন একটু লজ্জা পেল।

আমি বললাম, স্যার ওইতো আমার খুব কাছের বন্ধু  ছিলো। কখনো তো বুঝতে পারলাম না ওই এতো বিপদে চলে যাচ্ছে। নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, তোরা কি এসব জানতি?

নিলয় শুধু মাথা নাড়ালো- হ্যাঁ-না কিছুই বললো না।

ইকবাল স্যার বললেন, আজ তোমাদেরকে পড়ানোর মন-মানসিকতা আমার নেই। আমার মন ভালো হলে তোমাদের সবাইকে জানিয়ে দিবো।

আমি বুঝতে পারলাম- স্যার অনেক কষ্ট পেয়েছেন।কারণ আশিক'কে স্যার অনেক আদর-স্নেহ করতেন।

আমি বললাম, স্যার মন খারাপ করবেন না। আমরাও ওর খুব কাছের বন্ধু। আপনি মন খারাপ করলে তাহলে আমাদেরও অনেক খারাপ লাগবে। 

-আসলে মন খারাপের কথা না আহমদ। তোমরা আমাদের স্টুডেন্ট। তোমাদের ভালো-মন্দ আমরা যদি না জানি এবং তোমাদের ভালো-মন্দ যদি আমাদেরকে না জানাও তাহলে কিভাবে আমরা তোমাদের হেল্প করবো- বলো? আমি বুঝতেছি না, এখানে কি আমাদের শিক্ষকদের দূর্বলতা আছে নাকি তোমাদের? আমি তো তোমাদের সাথে সবসময় ফ্রি থাকি। আমার ভালো লাগা, খারাপ লাগা যদি আমি তোমাদের শেয়ার করতে পারি তাহলে তোমরা কেন ভালো-খারাপ লাগা আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারো না। আজ যদি আশিক তার প্রবলেমের কথা আমার সাথে শেয়ার করতো তাহলে তার হয়তো  এরকম বিপদের মুখোমুখি হতে হতো না। আমি চাই, তোমরাও আমার সাথে আশিকের মতো এরকমটা করবে না। তোমাদের উপর আমার প্রবল বিশ্বাস আছে। তোমাদের যেকোনো সমস্যা আমাদের স্যার-মেডামদের সাথে শেয়ার করবে। স্যার-মেডামেরা সবসময় আন্তরিক থাকে- তারা অবশ্যই  তোমাদের সমস্যার সমাধান খুঁজে দিবে। আশা রাখি, এতে তোমাদের অনেক উপকার হবে। আজ তাহলে তোমরা যাও। কবে আসবে তা আমি তোমাদের জানিয়ে দিবো। একটা কথা সবসময় মনে রাখবে- স্যার-মেডামেরা কখনো তোমাদের অমঙ্গল চায় না। তোমাদের জীবন মঙ্গলময় হোক।

আমি স্যারের রুম থেকে বের হয়ে বললাম, তোরা কি আমার সাথে একটু পার্কে যেতে পারবি? 

-নিলয় বললো অবশ্যই। 

-দূর্জয় বললো, "তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে।"      -আকাশ বললো, "বন্ধু তোর কাছে কিছু কথা শেয়ার করতে চাই।"

"তোদের সবার কথায় আমি শুনবো। কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছে না- তোরা কিভাবে আশিকের ব্যাপারগুলো আমার কাছে গোপন রাখতে পারলি।"

- আসলে আশিক তোকে অনেক ভালোবাসে। আমাদের সবার মাঝে তুই সবচেয়ে বেশি ভালো। নিলয়, একদিন আশিকের ব্যাপারে তোকে বলতে চেয়েছিলো কিন্তু আশিক না করে দেয়। কারণ এসব ব্যাপারে তুই জানলে অনেক কষ্ট পায়তি। তাই এসব আর তোকে বলা হয় নাই। (দূর্জয়)

-ওয়াউ, সত্যিই তোরা আমার গ্রেট ফ্রেন্ড। একটা ফ্রেন্ড নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে আর তিন বন্ধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাতের তালি দিচ্ছে-বাহ্ বাহ্! তোরা পারিসও বটে।

আচ্ছা যাইহোক, কি হয়েছিলো আশিকের সাথে? কেনইবা তাকে মাদক নিতে হলো!

আকাশ বলা শুরু করলো, শোন তাহলে- আমাদের কলেজের রুপাকে তো তুই ভালো করেই চিনিস। একদিন রুপা এসে আশিক'কে একটা লেটার দিয়ে যায়। আমরা ভাবলাম-তেমন কিছু না। হয়তোবা কোনো ইংরেজি লেখা-টেখা হবে। তাই আশিক কিছু মনে না করে পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো এবং বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খুলে দেখে লাভ-লেটার। এত সুন্দর হাতের লেখা আর শব্দশৈলী তুইও যদি পড়তি তাহলে তুইও ঐদিন রুপার প্রেমে পরতি। যাইহোক, সেদিন রাত থেকে দুজনের প্রেম শুরু হয়ে গেলো।

-আমি বললাম, কিভাবে? কাগজের চিঠি পড়ে কি সে দৌড়ায়ে রুপার ঐখানে গিয়েছিল? 

-আরেহ, বোকা না। চিঠির শেষে রুপার ফোন নাম্বার দিয়েছিলো। এই যে কথা বলা শুরু হলো এর আর শেষ হয় না। তুই পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়স তোকে তো আর সব বলা যায় না।

-সমস্যা নাই। সব শুনতেও চাই না। শুধু ইঙ্গিত দিয়ে যা। মূল ঘটনা কি সেটা বল?

-এভাবে ছয় মাস চলে গেলো। একদিন তাদের সামনাসামনি দেখা হলো। এই দেখাদেখির মধ্যেই তাদের লজ্জা শরম হ্রাস পেয়ে গেলো। এমন এক সময় আসলো, দুজন-দুজনে এক সেকেন্ড না দেখলে আর থাকতে পারে না। বলতে পারিস, অবৈধভাবে তাদের প্রেমের সম্পর্ক আরোহ প্রসারিত হলো। 

-সে কি জানতো না? অবৈধ সম্পর্ক ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। সে তো মুসলমান এতটুকু তো জানার কথা।

- শোন বন্ধু, প্রত্যেক মুসলমানই জানে- এসব অনৈতিক সম্পর্ক হারাম। আমাদের কলেজের অবস্থা মনে হয় তাহলে তুই কিছুই জানস না। কোন জগতে আসছস তুই। নিলয় তুই কিছু বল?

-আসলে কি বলবো- "আমি তো নিজেই এতোটা ভালো না।" দেখ আহমদ, এটা শুধু আমাদের কলেজের ব্যাপার না- দেশের যত স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটি আছে প্রায় প্রত্যেকেই ছেলে-মেয়েই কারো না কারো সাথে সম্পর্ক আছেই। এরা কিন্তু সকলেই মুসলমান। কেউ তিনটা, কারো চারটা আবার অনেকের বিশ-পঁচিশের উপ্রেও রিলেশনশিপ আছে।

-আকাশ আর নিলয়ের কথা শুনে আমার মাথা হ্যাং হয়ে গেলো। তাদের কথাগুলো যেন আমার মাথার উপ্রে দিয়ে গেলো। হায়রে, আমাদের মুসলমান যুবক-যুবতীদের এতটা নৈতিকতার অবক্ষয় হয়েছে। এত কিছু জেনেশুনেও কিভাবে হারাম কাজের দিকে পা বাড়ায়। 

তারপর কি আশিকের কি হলো? যেভাবেই হোক আমাদের আশিক'কে অবশ্যই বাঁচাতে হবে!

-একবছরের মাথায় রুপা আর আশিকের সম্পর্কের কথা তার পরিবার জানতে পারে। এরপর থেকে রুপাকে তার পরিবার আর কলেজে আসতে দেয় নাই। শুনেছিলাম, রুপাদের ফ্যামেলি না কি একটা প্যাক্টিসিং মুসলিম পরিবার ছিলো। (আকাশ)

-আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, একজন প্যাক্টিসিং মুসলিম পরিবারে জন্ম হয়ে এসব ছেলে-মেয়ে কিভাবে অবৈধ সম্পর্কের দিকে পা বাড়ায়। একটুও কি ভয় হয় না?

-এরপর আশিক অনেক যোগাযোগ করে কিন্তু রুপার কোনো খোঁজ-খবর পায় না। আমি শুনেছিলাম, রুপার বাবা না কি তার ফ্যামিলিসহ কোথায় চলে গেছে? কিন্তু কোথায় চলে গেছে তার খোঁজ খবর কেউ জানে না। (আকাশ)

-আর একূল ওকূল হারিয়ে আশিক এই পথ বেছে নেয়। বিশ্বাস কর, আমরা কেউ জানি না যে ও এতদূর খারাপ পথে চলে গিয়েছে। (কান্নার সুরে দূর্জয়)

-আমাদের ঐসময় ওর বাসায় যাওয়া উচিত ছিলো যখন ওই কলেজে আসা বন্ধ করে দিয়েছিলো। ভুল আমাদের সকলের হয়েছে। কারণ আমিও আমার অনেক পারসোনাল কথা তোদের বলি নাই। (আহমদ) 

নিলয় বললো, তোর আবার কিসের পারসোনাল কথা। তুই অনেক ভালো, পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়িস, কখনো মিথ্যা কথা বলিস না, দ্বীনের পথে আছিস, এটাই আমরা জানি। কিন্তু আমাদের তিনজনের পারসোনাল কথা জানলে কোনোদিন আমাদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্কের জন্য হাত বাড়িয়ে দিতি না। আমাদের সকলের গোনায় ভরা জীবন। 

-দূর্জয়, আকাশ আর নিলয় সম-সুরে হুমম বললো।

-শোন, আমি কলেজে ওঠার আগে মুসলমান হয়েছি।

-বলিস কি?(সম-সুরে)

-হুমম। একদমই মিথ্যা কথা বলি নাই। সত্য কথা বলেছি। আমার মা একজন হিন্দু আর বাবা খ্রীষ্টান। বুঝ তাহলে কেমন আমার জীবন। আমি যে মুসলমান হয়েছি এখনো আমার বাবা-মা কেউ জানে না। আজ তোদের সব খুলে বললাম।

- আকাশ, দূর্জয় আর নিলয়ের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। তোকে তো দেখে বুঝার কোনো উপায় নেই যে তুই হিন্দু। 

-ঠিক ধরেছিস। আমি এমনভাবে চলাফেরা করি- মা-বাবা এমনকি তোরাও পর্যন্ত বুঝতে পারিসনি। 

দূর্জয় বললো, আমি খুব বড় সমস্যায় ভুগতেছি। পর্ণোগ্রাফি দেখতে দেখতে দেখ আমার শরীরের অবস্থা কেমন হয়ে গেছে। মাস্টারবেশন ছাড়া রাতে আমি ঘুমাতে পারি না। আহমদ, আমি সুন্দর করে বাঁচতে চাই। আমি আবার আমার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চাই।

'প্লীজ তোরা আমাকে হেল্প কর।'

-শোনই, তুই তোর ভুল বুঝতে পেরেছিস। কত বড় মারাত্মক একটা ভুল বুঝতে পেরেছিস একটা বার খেয়াল করে দেখ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি উভয় ঠোঁটের মধ্যভাগ (জিহ্বা) ও দুই রানের মধ্যভাগ (লজ্জা স্থান) হেফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করে আমি তার জন্য জান্নাতের দায়িত্ব গ্রহণ করি।’(বুখারি, হাদিস নং- ৬৪৭৪)। যদি জান্নাতে যেতে চাস তাহলে আজ থেকেই আল্লাহর কাছে তওবা করে মাপ চেয়ে নে। বেশি ভালো হয় যদি হুজুরের কাছে গিয়ে তওবা করিস। আমি যে হুজুরের কাছে মুসলমান হয়েছি চাইলে তুই ও ঐ হুজুরের কাছে গিয়ে তওবা করতে পারিস।

"এদিকে আকাশ বলতেছে, আহমদ তুই হিন্দু পরিবারের সন্তান থেকে মুসলমান হয়ে দ্বীন পালন করেতেছিস। সত্যি সত্যিই বলতেছি, আজ আমার লজ্জা হচ্ছে। নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। আমার মতো এত অসহায় হয়তো এই মহূর্তে আর কেউ নাই। আমি মুসলমান ঘরের সন্তান হয়েও নামায পড়ি না, মিথ্যা বলি, কুদৃষ্টি করি। আমার কি হবে রে ভাই? আমি কি দ্বীনের পথে তোর মতো ফিরে আসতে পারি না?"

 'অবশ্যই পারিস। হতাশ হচ্ছিস কেন? আমার কথাগুলো একটু তোর মনোযোগের কানে শুনিস।'

"পরম করুণাময় মহান আল্লাহ তায়ালার অনেকগুলো সিফাতি বা গুণবাচক নামের মধ্যে দুটি হল, গফুর ও গাফফার; যার অর্থ- মহা ক্ষমাশীল।"

'বান্দা যত অপরাধ কর্মই করুক, ক্ষমতার আঁধার যিনি, মহামহিম তিনি, যার কাছে দয়া ও ক্ষমার অফুরন্ত ভাণ্ডার রয়েছে, তাঁর কাছে যদি পাপী বান্দা অনুনয়-বিনয় করে, প্রাণের পুরোটা আবেগ উজাড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করে, চোখের দুটো পাতা ভিজে যায়- তখন মহান আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তাআ'লা তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন।'

আরোহ শোনই,

'তিনি শুধু ক্ষমা করেই খ্যান্ত হন না, তার প্রতি সন্তুষ্টির ঘোষণা দেন। তওবাকারীর জন্য প্রভূত পুরস্কারের প্রতিশ্রুতিও দিয়ে রেখেছেন তিনি।'

"আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেন, নিশ্চয় তিনি আল্লাহ, ক্ষমাশীল, পরম ক্ষমাপরায়ণ। নিশ্চয়ই আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল।"(সূরা: হজ্, আয়াত: ৬০)

দ্বীনের পথে ফিরে আয়-ইনশাআল্লাহ তোর সমস্ত গোনাহ আমার আল্লাহ মাপ করে দিবেন।

আমার কথা বলতে শেষ হতে না হতেই- নিলয় বললো, আমি হয়তো পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তে পারি না। তবে রেগুলার দুই তিন ওয়াক্ত পড়ি। বিশেষ করে প্রতিদিন আমার ফজরের নামায কাযা হয়। এর কারণ হলো, নামায কালাম পড়লেও আমি নিয়মিত মিউজিক শুনা, মুভি ও সিরিয়াল দেখা বাদ দিতে পারি নাই। মুভি না দেখলে আমার রাতে ঘুম ধরে না। বলতে পারিস, আমি একজন মুভিখোর। পড়াশোনা তো আমার দ্বারা হয়িনা আবার নিজের সময়ের সদ্যবহারও করতে পারি না। কি করবো এখন আমি? আমি কি মুভি আর সিরিয়াল দেখা ছাড়তে পারবো না? না কি এসব নিয়ে সবসময় পরে থাকবো? এই অভ্যাস কি আমার সারা জীবনই অভ্যাস থেকে যাবে?

-কেন অভ্যাস থেকে যাবে বলইতো দেখি! তুই নিজেই তোর অভ্যাস পরির্বতন করে নিবি। আমি বললাম, নিজে নিজেই একটা রুটিন করে নে। আমি মনে করি আমাদের সকলের এরকম একটা প্রাত্যাহিক চলার ও কর্মের  রুটিন দরকার!(আহমদ)

-দূর্জয় চুপ করে আছস কেন?

আকাশ আমি কি ঠিক বলছি না?

-অবশ্যই ঠিক বলেছিস। দূর্জয় বললো, আজকে গিয়েই রুটিন বানাবো 'ইনশাআল্লাহ।'

-শোন নিলয়, একদিনেই যেমন কোনো অভ্যাস গড়ে ওঠে নি ঠিক তেমনি একদিনেই তোর এই অভ্যাস পরিবর্তন হবে না। তাই তোকে আগে রুটিন তৈরি করে রুটিন মোতাবেক নিজেকে চালাতে হবে।

আর একটা কথা সব সময় তোর মাথায় রাখতে হবে- একমাত্র আল্লাহর ভালোবাসা ও মহব্বত পাওয়ার জন্য তুই এসব গান, নাচ, মুভি ও সিরিয়াল দেখা বাদ দিতেছিস কারন গান- বাজনা বা music তা দেখা ও শোনা সম্পূর্ণ হারাম ।

একটা কথা সবসময় মনে রাখার চেষ্টা করিস- টেন্ডের সাগরে নিজেদের তুলিয়ে দিস না। আর যদি দেস তাহলে সাগরের তুলি কখনো খুঁজে পাবি না। পথভ্রষ্ট হয়ে যাবি। কখনো সঠিক পথ পাবি না।

আল্লাহ তাআ'লা কোরআনে বলেন, 

মৃত্যুর মতো সত্য আর কিছু নেই। সব আত্মাকে একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদের সুরা আল ইমরান- আয়াত: ১৮৫; সুরা আম্বিয়া-আয়াত :৩৫; সুরা আনকাবুত- আয়াত: ৫৭-তে বলেছেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ আর এ মৃত্যু হয়ে থাকে আল্লাহ তাআলার নির্দেশে। অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ মৃত্যুবরণ করতে পারে না। সে জন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে (সুরা আলে ইমরান : ১৪৫)

তিনি জন্ম-মৃত্যুর স্রষ্টা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর আল্লাহ জীবন ও মরণ দান করেন এবং তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৫৬)

শক্ত করে আল্লাহ কে ধর, একদিন দেখবি আর সিনেমা মুভি সিরিয়াল এসব দেখতে মন চাচ্ছে না। যখনি মুভি বা সিরিয়াল দেখতে যাবি তখনি বার বার মরণের কথা খেয়ালে আনবি। দেখবি শয়তান আর তোকে ধোঁকা দিতে পারবে না।


 

সর্বশেষ সংস্করনঃ 2022-10-06T20:36:45+06:00
© কপিরাইট আর্টিকেল লিখুন
ইলমুল ইসলাম

ইলমুল ইসলাম - ইসলামের আলোয় আলোকিত জীবন। ইলমুল ইসলাম মূলত সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় প্রস্তুত একটি ইসলামিক সাইট, যেখানে ইসলাম সম্পর্কিত সকল তথ্য পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ।

Nothing Bhai

  একটি মন্তব্য করুন

*বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ করে কোনো প্রকার স্প্যাম বা আপত্তিকর কমেন্ট করবেন না। এটা একটা ইসলামিক সাইট। এছাড়া নিজেদের কোনো বিজ্ঞাপন এর লিংক প্রকাশ করবেন না। সকল কমেন্ট এডমিন ও মোডারেটরদের দ্বারা যাচাই বাচাই করা হয়ে থাকে। নিরাপত্তা জনিত কারণে কিছু কমেন্ট মুছে ফেলা হতে পারে। এমনকি কিছু আইডি পার্মানেন্টলি ব্লকও করা হয়ে থাকতে পারে। বিস্তারিত জানতে কমেন্ট এর নীতিমালা দেখুন।