![]() |
| Photo Source : Freepik |
১. মনকে স্থির করুন:
হারাম রিলেশনশিপকে বিদায় জানাতে হলে সবার আগে আপনাকে নিজের মনের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। যা কিছুই হোক না কেন আপনি আর হারাম রিলেশনশিপ চালিয়ে যেতে চান না— এটা মনের মধ্যে গেঁথে নিতে হবে। এটা করার পর আপনি যা করবেন, আসুন জেনে নেই।
2. তাকে ঝুলিয়ে রাখবেন না:
এটাই সময়। আপনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা সম্পর্কে তাকে সাফ সাফ জানিয়ে দিন। তাকে ঝুলিয়ে রাখবেন না। সে চাইবে কম্প্রোমাইজ, আবেগ, স্মৃতি, হুমকি, অশ্রু ইত্যাদির মাধ্যমে আপনাকে ধরে রাখতে। কিন্তু আপনি নিজের দৃঢ় সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাকে অবহিত করুন, যেন তার মনে কোনো সন্দেহ বাকী না থাকে।
3. বিদায় নিন:
তাকে স্পষ্টভাবে বলে দিন আপনি আর তার সাথে সম্পর্ক রাখছেন না। আপনি এটা করছেন আল্লাহর জন্য। তাকে বলুন সে যেন আপনার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা না করে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি ইমেইলের মাধ্যমে এটা করেন। লেখাটুকু সংক্ষিপ্ত রাখুন। এমন কিছু লিখবেন না যাতে সে উত্তর দেওয়ার জন্য আগ্রহী হয়।
4. ভেঙে ফেলুন সেতুবন্ধন:
তার সব ইমেইল, মেসেজ, ফেসবুক চ্যাট, ফোন নম্বর, তার ছবি এবং অন্য যা কিছু আপনাকে তার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে সবকিছু ডিলিট করুন। তার সাথে স্বাভাবিক কথা বলাকে এড়িয়ে চলুন। এড়িয়ে চলুন এমন জায়গা যেখানে তার সাথে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে নিজের সাথে অবশ্যই তখন এমন কাউকে রাখবেন যার সামনে তার সাথে আপনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন না। সে কি করছে, কেমন আছে এসব ভাবা এবং খোঁজ রাখা ছেড়ে দিন। অনলাইনে তাকে সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ব্লক করে দিন।
5. নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করুন; গান শুনবেন না:
আমরা এখানে গান শোনার বৈধতা নিয়ে কথা বলছি না।একটা জিনিস আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে গান আমাদের আবেগকে জাগিয়ে তোলে, আর এই মুহূর্তে আপনি ভঙ্গুর মানসিকতাকে মোকাবেলা করছেন। আপনি যে গানই শুনবেন মনে হবে সেটা আপনাদের দুজনকে নিয়েই গাওয়া হয়েছে। তাই স্যাড সং তো দূরের কথা কোনধরণের গানই শুনবেন না, যতদিন না আপনি একটা স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছাচ্ছেন। নিজেকে সময় দিন।
6. অবাক হওয়া বন্ধ করুন:
সে আপনার কথা এখনো ভাবে — এটা শুনে অবাক হওয়া বন্ধ করুন। এই উছিলায় তাকে আপনার সাথে যোগাযোগের সুযোগ দিবেন না। বিশ্বাস রাখুন ক'দিন পর সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। সময়ের সাথে সাথে সেও আপনাকে ভুলে যাবে। ঘুমানোর আগে একদৃষ্টে ঘন্টার পর ঘন্টা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। তার বদলে বই পড়ুন। এমন বই পড়ুন যা পড়লে পুরো পৃথিবীকে ভুলে সেই বইয়ের মধ্যে ডুবে যাওয়া যায়। হতে পারে সেটা গোয়েন্দা/থ্রিলার উপন্যাস। নিজের আত্মমর্যাদা বজায় রাখুন।
7. জেনে রাখুন তারা কখনোই আপনার জন্য সঠিক ছিলো না:
কোনো জিনিস ভুল হলে সময়ের সাথে সাথে তা ঠিক হয়ে যায়না। বুঝতে চেষ্টা করুন তারা কখনোই আল্লাহর জন্য আপনাকে ভালোবাসে নি। আপনার এমন কিছু দরকার যার ভিত্তি সঠিক। বিয়েই একমাত্র জিনিস, যার ভিত্তি সঠিক।
8. শূণ্যস্থান পূরণ করুন:
আল্লাহর সাথে কথা বলুন এবং তাঁকে জানান আপনার কেমন লাগছে, আপনি যে ভাষা জানেন সে ভাষায়ই। কান্না আসলে মন খুলে কাঁদুন। আল্লাহর কাছে যাওয়ার জন্য যা করতে পারেন করুন। যদি ইতোমধ্যে প্রতিরাতে তাহাজ্জুদ আদায়ের অভ্যাস না করে থাকেন তাহলে শুরু করুন। ছোট ছোট স্টেপ নিন। আল্লাহ তাঁর দরজা খুলে রেখেছেন আপনার জন্য।
9. পছন্দের কাজগুলো করুন:
যে কাজগুলো করতে আপনি উপভোগ করেন, সেগুলো করা শুরু করুন। হ্যা, এই মুহূর্তে তা একটু কঠিন হতে পারে। তবে এই স্টেপটা আপনাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। খেলাধূলা করুন, ঘুরতে যান, দ্বীনদার বন্ধুদের সাথে সময় কাটান, নাশিদ শুনুন, তিলাওয়াত শুনুন, পছন্দের লেখকের বই পড়ুন। মনকে সেসব কাজে ব্যস্ত রাখুন যা আপনাকে আনন্দ দেয়।
10. আল্লাহর সাথে রিলেশনশিপ তৈরি করুন:
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসায় হৃদয়কে পূর্ণ করুন। এই পূর্ণতা আপনি কোনো মানুষকে ভালোবেসে পাবেন না, যেটা আল্লাহকে ভালোবেসে পাওয়া যায়। আপনি জানেন যে তিনি সবসময় আপনার খেয়াল রেখেছেন, আপনার পাশে থেকেছেন। তাঁর প্রতি ভরসা রাখুন এবং তাঁর ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তিনি আপনাকে অবহেলা করবেন না। মাঝে মাঝে শুধু দুজনে সময় কাটান; আপনি এবং আপনার রব।
11. উত্তম কিছুর জন্য দোয়া করুন:
আমরা উম্মে সালামাহ রা. এর গল্প জানি, যে অসাধারণ মহিলা সাহাবির স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি ভালো ভালো কিছুর জন্য দোয়া করেছিলেন এবং আল্লাহ তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে তার স্বামী হিসেবে দান করে তার দোয়ার প্রতিদান দিয়েছিলেন। জেনে রাখুন আল্লাহই সেরা পরিকল্পনাকারী। তিনি আপনার জন্য এমন কাউকে রেখেছেন যে আপনাকে আল্লাহর আরো কাছে পৌঁছে দিবে এবং আপনাকে সুখী করবে। আপনার জন্য নির্ধারিত সেই চক্ষু শীতলকারী/কারিনীর জন্য অপেক্ষা করুন, যাকে আপনার বুকের পাঁজর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
12. বেশি বেশি সৎকর্ম করুন:
যখনই আপনার নিজেকে অগোছালো আর পাপী মনে হবে, তখনই কিছু সৎকর্ম করুন। দান করুন। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে, একাকী আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হোন। ক্ষুধার্তকে খাবার দিন। এতিম বা পথশিশুদের সাথে একটু সময় কাটান। কিছু বাড়তি রোজা রাখুন। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান যে তিনি আপনাকে গুনাহ থেকে বাঁচিয়েছেন। নিশ্চয়ই তিনি সবচেয়ে ক্ষমাশীল, সবচেয়ে দয়ালু।
13. বিয়ে নিয়ে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করুন:
তরুণরা তাদের অধিকাংশ সময় বিয়ে নিয়ে স্বপ্ন দেখে পার করে। অধিকাংশ দ্বীনদার তরুণ-তরুণী ভাবে হারাম কিছু নিয়ে চিন্তা করার চেয়ে বিয়ে নিয়ে চিন্তা করা উত্তম। কিন্তু জেনে রাখা দরকার যে শয়তান অনেক সময় নেক সুরতে আসে। বিয়ের কথা ভাবতে গেলে পাত্র/পাত্রীর কথা ভাবনায় আসবে। আর তখন শয়তানের কাছে আপনাকে পদস্খলিত করা খুব সহজ হয়ে যাবে। বিয়ের জন্য প্রস্তুত থাকলে বিয়ে করে ফেলুন। আর প্রস্তুত না থাকলে প্রস্তুতি অর্জন করুন। না ভেবে অর্জনের জন্য কাজ করুন। বিয়ে নিয়ে স্বপ্ন না দেখে বড় কিছু নিয়ে স্বপ্ন দেখুন এবং তারুণ্যকে কাজে লাগান। রাসূল সা. বলেছেন, "বার্ধ্যক্যের পূর্বে তারুণ্যকে কাজে লাগাও।"
14. মা বাবাই সবচেয়ে আপন:
আপনার পিতামাতার সাথে আপনার সম্পর্ক গড়ে তুলতে এই সময়টি ব্যবহার করুন। সেইসাথে আপনি কেমন ফিল করেন সে সম্পর্কে তাদের সাথে কথা বলুন। আপনি একটি দুর্দান্ত অন্তর্দৃষ্টি পাবেন এবং তাদের সাথে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলবেন ইনশাআল্লাহ।
15. এই সময় খুব দ্রুত কেটে যাবে:
আপনি সময়ের সাথে সাথে এটি কাটিয়ে উঠবেন ইনশাআল্লাহ। জেনে রাখুন যে হারাম ত্যাগ করা আপনার বিবাহকে শক্তিশালী করবে যখন আপনি আল্লাহর রহমতে সঠিক মানুষটি খুঁজে পাবেন।
16. নিজেকে আবিষ্কার করুন:
আপনার ট্যালেন্টগুলো খুঁজে বের করুন। আপনি সবসময় করতে চেয়েছিলেন কিন্তু করা হয়ে উঠেনি এমন প্রোডাক্টিভ কাজগুলো করুন। আপনি উপভোগ করেন এমন কিছুতে আপনার স্কিল ডেভেলপমেন্ট করুন। সেটা হতে পারে ক্রাফটিং, লেখালেখি বা ক্যালিগ্রাফি।
17. নিজের যত্ন নিন:
এই কঠিন সময়ে নিজের যত্ন নিন। আপনার মন, শরীর এবং ক্বলবের খেয়াল রাখুন। কোনো একটি বই পড়ুন, আপনার ক্লাসের জন্য পড়াশোনা করুন, হেলদি খাবার খান, ব্যায়াম করুন, প্রচুর পানি পান করুন, সুন্দর পোশাক পরুন, কুরআন শুনুন এবং পড়ুন, কোনো ভাল লেকচার শুনুন, কোনো ইসলামিক অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবক হোন... মূলত, যে কোনও প্রোডাক্টিভ কাজের মাধ্যমে আপনি ভালো অনুভব করেন, তাই করুন।
18. জানুন কোনটা আপনার ট্রু লাভ:
হালাল প্রেম আসলে কি তা জানুন। আপনি যা জানতেন তা নয় এবং হলিউড এটিকে কীভাবে দেখায় তাও আসলে ট্রু লাভ নয়। বাস্তবে, হালাল প্রেম হলো, নবীজি সা. খাদিজা রা. এর মৃত্যুর অনেক পরে তাঁর গলার হার দেখে কেঁদেছিলেন। তিনি তাকে সমর্থন করেছিলেন যখন পুরো বিশ্ব তার দিকে মুখ ফিরিয়েছিল। হালাল প্রেম হলো আপনার স্ত্রীকে ভালবাসা ও তাকে দ্বীনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে আপনি একসাথে জান্নাতে অনন্তকাল কাটাতে পারেন। সত্যিকারের ভালবাসার অর্থ কী তা জানুন এবং তাহলে আপনি যে কোনও হারাম সম্পর্ককে দ্রুত কাটিয়ে উঠবেন।
19. একজন রোল মডেল বেছে নিন:
আপনার পরিচিত কোনো তরুণ, ধার্মিক, সুখী বিবাহিত ব্যক্তিদের সাথে আড্ডা দিন এবং কথা বলুন। তাদের পরামর্শ নিন এবং আপনার জীবনে নিজের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হিসাবে ব্যবহার করুন। কিভাবে তারা বিয়ে করেছে তাদের গল্প সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করুন, পরামর্শের জন্য তাদের সাথে কথা বলুন এবং তাদের কাছ থেকে শিখুন।
20. দ্বীনদার বন্ধুদের সাথে সময় কাটান:
এর জন্যই বন্ধুরা। এখন আপনি অবশেষে আপনার ভাই বা বোনদের সাথে শক্তিশালী বন্ড তৈরি করার একটি সুযোগ পেয়েছেন। তাদের সাথে সময় কাটানো এবং একে অপরকে আরও বেটার মুসলিম হতে উৎসাহিত করা এখন অনেক সহজ হবে। আপনার সবসময় এই সুযোগ থাকবে না, সুতরাং এই সময়কে কাজে লাগান।
21. দ্বীনদার ব্যক্তিদের সংস্পর্শে থাকুন:
এমন লোকদের সাথে থাকুন যারা জানে যে আপনি সেই হারাম সম্পর্কের মধ্যে থাকতে চান না। যদি আপনার এক বা একাধিক ধার্মিক বন্ধু থাকে যারা সেই হারাম সম্পর্কের বিষয়ে জানতো, তাহলে তাদের সাথে কথা বলুন এবং তাদের জানান যে আপনি এসব ছেড়ে দিয়েছেন ও আল্লাহর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। এটি নিজেকে উৎসাহিত করার একটি ভাল উপায়, এবং ইনশাআল্লাহ তারা আপনাকে উৎসাহিত করবে। যদি তারা এটি সম্পর্কে না জেনে থাকে তবে কনফেস করার দরকার নেই। শুধু তাদের সাথে আপনার সময়গুলোকে উপভোগ করুন কারণ এটি আপনাকে একজন ভাল মানুষ করে তুলবে।
আমি দুআ করি আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দিন যেন আমরা তাঁর অপছন্দনীয় সমস্ত কিছু থেকে দূরে থাকতে পারি। আমীন।
হাবিবুন নাহার মিমি{iiWriter}
সর্বশেষ সংস্করনঃ 2022-10-05T14:25:07+06:00
